রাত তখন প্রায় ১১টা। হাসপাতালের ওয়ার্ডজুড়ে নেমে এসেছিল স্বাভাবিক নীরবতা। হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ—কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয় চিৎকার, “আগুন! আগুন!”
মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের নতুন ভবনের পঞ্চম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডের এক কোণে আগুন লাগে। আগুন বড় আকার ধারণ না করলেও ঘন ধোঁয়া ও আতঙ্কে মুহূর্তেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় পুরো ভবনে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওয়ার্ডের এক পাশে রোগীদের জন্য রাখা ফোমের বিছানা, চাদর ও বালিশের স্তূপ থেকে প্রথমে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়লে রোগী, স্বজন, নার্স ও চিকিৎসকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যে যেভাবে পেরেছেন, রোগীদের নিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন।
এক হাসপাতাল কর্মী বলেন, “ধোঁয়া এত বেশি ছিল যে আগুন কোথায় তা বোঝা যাচ্ছিল না। সবাই শুধু রোগীদের নিরাপদে বের করার চেষ্টা করেছে।”
খবর পেয়ে হাসপাতালের স্টাফ ও স্থানীয়রা প্রাথমিকভাবে ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান। তবে ধোঁয়া ও তাপের কারণে তা সফল হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ঘটনায় আগুন নেভাতে গিয়ে চারজন আনসার সদস্যসহ মোট ছয়জন অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এদিকে রোগী সরানোর সময় ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। স্থানান্তরের সময় দুই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন পটুয়াখালী সদর উপজেলার বদরপুর এলাকার কাজী আতাউর রহমান (৮০) এবং বরিশাল সদরের বারৈজ্যের হাটখোলা এলাকার আবুল হোসেন (৬৭)।
স্বজনদের দাবি, কাজী আতাউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন এবং অক্সিজেনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। আগুন লাগার সময় তাকে অক্সিজেন ছাড়াই নিচে নামানো হয়। পরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি মারা যান।
অন্যদিকে আবুল হোসেন কয়েকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে তার ছেলে হাসপাতালে এসে বাবাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৃত দুই রোগীর শারীরিক অবস্থা আগে থেকেই আশঙ্কাজনক ছিল।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভাণ্ডার) ডা. আবদুল মুনায়েম সাদ বলেন, “মেডিসিন ওয়ার্ডের একটি স্থানে আগুন লাগে। দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস দ্রুত কাজ করায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।”
ফায়ার সার্ভিসের বরিশাল স্টেশনের স্টেশন অফিসার আবুজর গিফরী জানান, “ধোঁয়া বেশি থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লাগে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিড়ি-সিগারেট বা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তদন্তের পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।”
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নাজমুল আহসান বলেন, নতুন ভবনের দুটি ইউনিটে প্রায় ১০০ রোগী ভর্তি ছিলেন। তাদের সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে পুরোনো ভবনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।
রাতের সেই আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এলেও ধোঁয়া, দৌড়ঝাঁপ আর আতঙ্কের সেই মুহূর্ত অনেকের মনে রেখে গেছে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ—আর রেখে গেছে দুই প্রাণহানির ভারী শোক।