
গাছ নেই, রোপণের দৃশ্য নেই—তবু সরকারি অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ১৮ হাজার ৫১৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ ও একটি পৌরসভাকে ঘিরে সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্যেও মাঠপর্যায়ে বৃক্ষরোপণ না করার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে ১৮ হাজার ৫১৯টি গাছের হিসাব এলো কোথা থেকে?
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং সরকারি নথিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
কাগজে হাজার হাজার গাছ, মাঠে বাস্তবতা কী?
স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনার আওতায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সবুজায়নের লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বৃক্ষরোপণের অগ্রগতি ও প্রয়োজনীয় তথ্য—প্রমাণসহ প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে।
কিন্তু নলছিটির ক্ষেত্রে দাখিল করা প্রতিবেদনে মোট ১৮ হাজার ৫১৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথায় কতটি চারা রোপণ করা হয়েছে, কারা রোপণ করেছে, চারা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং রোপণের পর সেগুলোর পরিচর্যা কীভাবে হচ্ছে—এসব বিষয়ে দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
‘বরাদ্দ ছিল না, গাছও লাগানো হয়নি’
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ইউনিয়নের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃক্ষরোপণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা বরাদ্দ না থাকায় তারা মাঠপর্যায়ে বৃক্ষরোপণ করতে পারেননি।
দপদপিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জামাল হোসেন, কুলকাঠি ইউনিয়নের প্রশাসক ও উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম, সিদ্ধকাঠী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলাম এবং রানাপাশা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লাবু হোসেনের বক্তব্য বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া নাচনমহল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান, কুশঙ্গল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী হাওলাদার, মোল্লারহাট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ডা. আবু সালেহ এবং ভৈরবপাশা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম জানান, বৃক্ষরোপণের জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড বা বরাদ্দ না থাকায় তারা গাছ লাগাতে পারেননি।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদ থেকে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের তাগিদ থাকায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিবরা দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করে জমা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে বৃক্ষরোপণ করা হবে বলেও তারা জানান।
তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি
স্থানীয়দের মতে, অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা জানতে হলে শুধু কাগজপত্র নয়, সরেজমিনে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে—
ক্স প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ১৮ হাজার ৫১৯টি গাছের অবস্থান;
ক্স ইউনিয়ন ও পৌরসভাভিত্তিক বৃক্ষরোপণের সংখ্যা;
ক্স চারা ক্রয় বা সংগ্রহের নথিপত্র;
ক্স অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব;
ক্স বৃক্ষরোপণের স্থান ও জমির তথ্য;
ক্স রোপণের ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ;
ক্স সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা—কর্মচারীদের দায়িত্ব;
ক্স প্রতিবেদন প্রস্তুত ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া—
এসব যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউএনওর বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক প্রতীক কুমার কুন্ডু বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে তদন্ত সাপেক্ষে যদি এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘সরকারি প্রতিবেদনে ভুল তথ্য হলে দায় নির্ধারণ জরুরি’
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, সরকারি কোনো উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি প্রতিবেদনে বাস্তবতার সঙ্গে তথ্যের বড় ধরনের অসঙ্গতি থাকলে তার দায় কার? যদি সত্যিই বৃক্ষরোপণ না করে হাজার হাজার গাছ রোপণের তথ্য দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই তথ্য কে তৈরি করেছেন, কার নির্দেশে তৈরি হয়েছে এবং কে অনুমোদন করেছেন—তা তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তাদের মতে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শুধু কাগজে সংখ্যা পূরণ করা নয়; বরং বাস্তবে গাছ লাগানো, সেগুলো বাঁচিয়ে রাখা এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মসূচিতে জিও—ট্যাগযুক্ত ছবি, স্থানভিত্তিক তালিকা ও সরেজমিন যাচাই বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠেছে।
উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ১৮ হাজার ৫১৯টি গাছের হিসাবের বিষয়ে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হলে অভিযোগের সত্যতা যেমন যাচাই হবে, তেমনি নির্দোষ কেউ থাকলে তারাও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন। আর অনিয়ম বা মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিলের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তাই দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন, ইউনিয়ন ও পৌরসভাভিত্তিক সরেজমিন পরিদর্শন এবং দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রশ্ন এখন একটাই—১৮ হাজার ৫১৯টি গাছ যদি সত্যিই রোপণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই গাছগুলো কোথায়? আর যদি রোপণ না হয়ে থাকে, তাহলে সরকারি প্রতিবেদনে এত বড় সংখ্যার হিসাব এল কীভাবে?