
পিরোজপুরের কাউখালীতে ২০২৬ সালের দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে শিক্ষকদের একটি অংশ ব্যক্তিগত কোচিংয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।
এ বছর উপজেলার ১২টি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় ২৮৪ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে পাস করেছে মাত্র ১৩০ জন। পাশের হার ৪৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উপজেলার বেতকা মাহমুদিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২৩ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে পাস করেছে মাত্র ৬ জন। সপ্তগ্রাম দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১২ জনের মধ্যে পাস করেছে ২ জন। পঞ্চগ্রাম দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২১ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাস করেছে মাত্র ৩ জন। ওই মাদ্রাসায় পাশের হার মাত্র ১৪ শতাংশ।
এ ছাড়া শাপলেজা জয়তুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪ জন। বিজয়নগর আলিম মাদ্রাসা থেকে ১০ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাস করেছে ৬ জন। কাউখালী কেন্দ্রীয় ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ২৩ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাস করেছে মাত্র ৮ জন।
অন্যদিকে, উপজেলার এসএসসি পরীক্ষায় ৬১০ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে পাস করেছে ৪৩৯ জন। ভোকেশনাল পরীক্ষায় ১৪৫ জন অংশগ্রহণ করে পাস করেছে মাত্র ৭২ জন।
সার্বিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাদ্রাসা ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলাফল বিপর্যয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত কোচিং সেন্টারের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পাঠদান না হওয়ায় তারা কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে কোচিংয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কোনোভাবে পাস করলেও অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, “শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়ানো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর চেয়ে কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে অভিভাবকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরাও প্রকৃত শিক্ষার পরিবর্তে কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ছে। ফলাফলের এই চিত্র তারই প্রতিফলন।
এ বিষয়ে কাউখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হান্নান বলেন, “ফলাফল বিশ্লেষণ করে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। শিক্ষার্থীদের কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও কাউন্সেলিং করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার বিষয়ে শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল উন্নত করতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কাউখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভালো না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে কাউন্সেলিং করা হবে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুরুত্ব বাড়াতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষা কার্যক্রমে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে, যাতে আগামীতে ফলাফলের উন্নতি ঘটে।
অভিভাবকদের প্রত্যাশা, শুধু পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর নয়, সারা বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষকদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নের বিষয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দপ্তর কার্যকর নজরদারি করবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কোচিংনির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পাঠদান নিশ্চিত করা হলে আগামীতে কাউখালীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা।