বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ন
ভারতের ওড়িশায় হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর পৈশাচিক তাণ্ডব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজ্যটিতে এখন বিপদে পড়তে কোনো অপরাধ করার প্রয়োজন হয় না। কেবল ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ তকমা দিয়েই প্রকাশ্যে দিনেদুপুরে পিটিয়ে হতাহত করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের। হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিদের এই ব্যাপক নৃশংসতার মুখে প্রাণ হাতে নিয়ে বাইক, বাস কিংবা ট্রেনের সাধারণ কামরা— যেভাবে হোক রাজ্য ছেড়ে পালাচ্ছেন পরিযায়ী মুসলিমরা।
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওড়িশার বিজেপি শাসিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ তকমা দিয়ে টার্গেট করা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে এই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মুসলিম শ্রমিকরা জানান, গত ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে এক হিন্দু শ্রমিকের মৃত্যু এবং ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদে নতুন বাবরি মসজিদ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে ওড়িশায় তাঁদের ওপর প্রতিহিংসামূলক আচরণ চরমে পৌঁছেছে।
গত ২৭ ডিসেম্বর ভোরে ওড়িশার গঞ্জাম জেলায় মইনুল শেখ, হাবিজুল শেখ, খোকন শেখ এবং রাজিব শেখের ভাড়া বাসাতে হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর একদল সদস্য জোরপূর্বক ঢুকে পড়ে। তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিযুক্ত করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং সূর্যোদয়ের আগেই রাজ্য ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ৫ থেকে ১২ বছর ধরে সেখানে হকারি করা এই চারজন আতঙ্কিত হয়ে দুটি মোটরসাইকেলে করে ১৯ ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার শাহজাদপুর গ্রামে ফিরে আসেন।
রাজিব নামে এক শ্রমিক সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ১২ বছর ধরে ওড়িশায় হকারি করছি, কিন্তু এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। মাঝরাতের পর কিছু লোক এসে আমাদের গালিগালাজ করে এবং চলে যেতে বলে। আমরা প্রাণভয়ে সামান্য কিছু জিনিস ব্যাগে ভরে ভোরের আগেই বেরিয়ে পড়ি। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপেক্ষা করে আমরা টানা বাইক চালিয়ে বাড়ি ফিরেছি।
এই চারজনের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওড়িশার বিজেপি শাসিত অঞ্চলে গত ১৫ দিনে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নির্মাণ কাজ ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শত শত শ্রমিক এখন প্রাণভয়ে ঘরমুখো।
শ্রমিকদের দাবি, ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদে তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবির কর্তৃক একটি মসজিদ প্রকল্পের ঘোষণা এবং বাংলাদেশে দীপু দাস নামে হিন্দু শ্রমিকের মৃত্যুর পর ওড়িশায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।
সাহারুল শেখ নামে এক ঠিকাদার জানান, গঞ্জাম জেলায় আমার অধীনে কাজ করা ৪০ জন শ্রমিককে প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো আমাদের বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বলে গালি দিচ্ছে। মুর্শিদাবাদের কোনো শ্রমিক সেখানে এখন আর নিরাপদ নয়।
সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে সম্বলপুরে, যেখানে সুতির বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক জুয়েল শেখকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধেও ‘বাংলাদেশি’ হওয়ার সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। এছাড়া ভুবনেশ্বরে রফিকুল শেখ নামে এক শ্রমিককে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা মারধর করলে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি ভগবানগোলা ব্লক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় সূত্রে খবর, গত কয়েক দিনে ওডিশার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১,০০০ পরিযায়ী শ্রমিক মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন। জীবিকা হারানোর অনিশ্চয়তা থাকলেও তাদের অনেকেরই পণ—আর কোনোদিন সেখানে ফিরবেন না। তাদের সবার মুখে এখন একই কথা, “টাকার চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি।
সহরুল নামে এক শ্রমিকের ভাষ্য, সন্দেহ আর ঘৃণা দ্রুত বাড়ছে। মুর্শিদাবাদের মুসলমানদের আলাদা করে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। রাস্তায় বা কর্মক্ষেত্রে দেখা গেলেই আমাদের ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ কোনো নিরাপত্তা দিচ্ছে না, তারা স্রেফ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পালিয়ে আসা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ ছিল না।
হরিহরপাড়ার শাহজাদপুর গ্রামের অন্তত ২০ জন রাজমিস্ত্রি ওড়িশায় হেনস্থার শিকার হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গজপতি জেলায় কর্মরত নাজিমুদ্দিন শেখ প্রথমে দুর্গাপুর এবং সেখান থেকে বাসে করে হরিহরপাড়ায় পৌঁছান।
একই অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন সামসেরগঞ্জের উত্তর চাচণ্ড গ্রামের হকার নজরুল ইসলাম (৪৫)। ঝাড়সুগুড়ায় কর্মরত নজরুল বলেন, গেরুয়া পোশাক পরা একদল যুবক আমার ভাড়াবাড়িতে এসে আমি কী খাই আর কোথায় বাড়ি—সব জানতে চায়। আমাকে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জয় গোমাতা’ ধ্বনি দিতে বাধ্য করা হয় এবং ওডিশা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে পরদিনই কোনোমতে সংরক্ষিত টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠে ২৮ তারিখ বাড়ি পৌঁছেছি।
শাহজাদপুরের শাড়ি বিক্রেতা মইনুল শেখ (৪২) গত এক দশক ধরে ওড়িশায় কাজ করছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি আগে কখনও এমন ছিল না। মইনুলের কথায়, গত ১২ বছরে কখনও নিজেকে এত অসুরক্ষিত মনে হয়নি। গত দুই সপ্তাহ ধরে অত্যাচার শুরু হয়েছে। মুসলিম হকার ও রাজমিস্ত্রিদের টার্গেট করা হচ্ছে। এক রাতে ওরা আমার বাইক আটকে মারধর করার চেষ্টা করে এবং রাতেই ওড়িশা ছাড়ার শেষ সতর্কবার্তা দেয়। আমি সেই রাতেই পালিয়ে আসি।
এদিকে, ওড়িশায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর হামলা বন্ধ এবং জুয়েলের খুনের বিচারের দাবিতে গত সোমবার ভগবানগোলায় প্রায় ৪০০ শ্রমিক একটি প্রতিবাদ মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে তকমা দিয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানির মাধ্যমে টার্গেট করা হচ্ছে—ওড়িশার এই ঘটনা তারই প্রতিফলন।
মুর্শিদাবাদের জেলা শাসক নীতিন সিংহানিয়া জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে আছে। যারা ফিরে আসছেন তাদের ‘মহাত্মাশ্রী’ প্রকল্পের আওতায় মাসে ৫,০০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের চেয়ারম্যান সমীরুল ইসলাম বলেন, বাংলাই একমাত্র রাজ্য যেখানে শ্রমিকদের জন্য আলাদা বোর্ড আছে।
অন্যদিকে, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী এই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি জানান, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলার শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আমি ওড়িশা বিধানসভা ঘেরাও করব।
ওড়িশা পুলিশ অবশ্য দাবি করেছে, তারা এই ধরনের কোনো হামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এখনো পায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তারা জানিয়েছে।
Leave a Reply