রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০২:৫৯ অপরাহ্ন
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে এখন যেন উৎসবের আমেজ। প্রতিদিন দূর—দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন এক নজর বিশালাকৃতির কালো ষাঁড় “কালো মানিক”—কে দেখতে। চকচকে কালো শরীর, বিকট হাম্বা ডাক আর প্রায় ৪৪ মণ ওজনের এই গরুটির কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছেন তার বিশাল দেহ।
একসময় বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়াকে উপহার দেওয়া হয়েছিল এই গরুটি। খালেদা জিয়া উপহার গ্রহণ করে কৃষক সোহাগ মিয়াকেই তার পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে উপহার হিসেবে গরুটি দিয়ে দেন। এবার আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সেই আলোচিত “কালো মানিক” বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গরুটির মালিক কৃষক সোহাগ মৃধা।
প্রায় ৪৪ মণ ওজনের এই বিশালদেহী ষাঁড়টি ইতোমধ্যেই জেলার অন্যতম আলোচিত কোরবানির পশুতে পরিণত হয়েছে। ফ্রিজিয়ান প্রজাতির ১২ ফুট লম্বা ও সাড়ে ৫ ফুট উচ্চতার গরুটির দাম হাঁকানো হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। শুধু গরুই নয়, এর সঙ্গে একটি বড় ব্ল্যাক বেঙ্গল প্রজাতির অর্ধলাখ টাকা মূল্যের ছাগল উপহার দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন সোহাগ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মির্জাগঞ্জ উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর ঝাটিবুনিয়ায় কৃষক সোহাগ মৃধার বাড়িতে যেন ছোটখাটো মেলা বসেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন শুধুমাত্র “কালো মানিক”—কে এক নজর দেখার জন্য।
খামারে গিয়ে দেখা যায়, গরুটির পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সোহাগ মৃধা ও তার স্ত্রী সুলতানা বেগম। পরিবারের সদস্যরাও যেন কালো মানিককে ঘিরেই দিন কাটান। সোহাগের ছোট ছেলে জিসান গরুটির পিঠে উঠে চিরুনি দিয়ে লোম আচড়ে দিচ্ছেন, বিশাল দেহের গরুটি মাঝে মধ্যেই হাম্বা ডাক দিচ্ছে আবার কিছুক্ষণ শো শো শব্দ করছে।
পাশ থেকে আরিফ নামে স্থানীয় একজন বলে উঠলেন, ভাই, ওর ডাক প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়। আর রেগে গেলে ৮—১০ জন মিলেও সামলানো যায় না। গাছের সাথে মোটা দড়ি প্যাঁচাইয়া ধইরা রাখতে হয়। এত বড় গরু পটুয়াখালী জেলায় আর আছে কিনা সন্দেহ।
স্থানীয় বাসিন্দা সানোয়ার হাওলাদার বলেন, প্রতিদিন এই গরুটি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন। গরুটির শরীর একদম তেলের মত চকচকে। আমি কখনও এত বড় গরু দেখিনি। আশা করি সোহাগ এই গরুটি ভালো দামে বিক্রি করতে পারবে।
আরেক বাসিন্দা মাহমুদ হাসান বলেন, প্রায় ৭—৮ বছর ধরে গরুটিকে আমাদের সোহাগ ভাই লালন পালন করে আসছেন। কিন্তু এখন তিনি গরুটি বিক্রি করবেন এটা ভাবতে আমাদেরও খারাপ লাগে। কী আর করবেন, তারও তো চলতে হবে। শুনেছি গরুটির লালন—পালনে অনেক খরচ।
মুরাদ নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উপহার দেওয়া হয়েছিল এই গরুটি। তিনি সেটি গ্রহণ করে আবার সোহাগ ভাইকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এই গরুটি যিনি কিনবেন সে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপহার দেওয়া স্মৃতি পাচ্ছে এটা সৌভাগ্যের ব্যপার।
কৃষক সোহাগ মিয়ার স্ত্রী সুলতানা বেগম বলেন, আমার ২টা সন্তান। তার পাশাপাশি কালো মানিকও আমার আরেক সন্তান। ৭ বছর ধরে সন্তানের মত আদর দিয়ে ওরে বড় করছি। কিন্তু এখন ওরে বিক্রি করে দিব। এত বছর পালছি। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওর দেখাশোনা করছি। কী আর করার, বর্তমানেও প্রতিদিন ১০০—১২০০ টাকা খরচ হয় শুধু ওর পেছনে। তাই ভাবছি এটা বিক্রি করে আমাগো ঘর তুলমু সংসারের অন্য কাজে লাগামু। এরপর আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য একটা মিলাদও দিমু।
কৃষক সোহাগ মৃধা বলেন, আমার অনেক ইচ্ছা আছিল আমার মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গরুটি উপহার দিব। গতবছর তার জন্য এটি নিয়ে ঢাকায় যাই। নেত্রী আমাদের উপহারটি গ্রহণ করে আবার খুশি হইয়া আমার ছোট্ট ছেলেকে দিয়া দিছেন। আমরা প্রায় ৭০ জন মানুষ গরু নিয়া গেছিলাম ঢাকার গুলশানে। সেখানে আমাদের নানান খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হইছে। আমরা খুব ই খুশি হইছি।
তিনি আরও বলেন, পাশের চৈতা এলাকা থেকে গরুটির মাকে কিনেছিলাম। তার বাছুর এই কালো মানিক, ছোটবেলায় এই নামটি দিয়েছি। ৭ বছর ধরে ওরে লালন—পালন করছি। নিজ সন্তানের মত আগলাইয়া রাখছি। ওরে ঘাস, ভুষিসহ সব প্রাকৃতিক খাবার খাওয়াইছি তাই এত বড় হইছে। বর্তমানে প্রতিদিন অনেক টাকা খরচ হয় ওরে খাওয়াইতে। তাছাড়াও পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে এখন গরুটি বিক্রি করে দিব। এরপর সেই টাকায় আমার মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে বড় করে মিলাদও দিমু। গরুটির দাম চাইছি ২২ লাখ টাকা। যে কিনবে তারে খুশি হইয়া সাথে প্রায় ৫০—৬০ হাজার টাকা দামের একটা ছাগলও দিব। গরুটি যে কিনবে সে জিতবে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কৃষক সোহাগ মৃধাকে ষাঁড়টি পালনে শুরু থেকেই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে নানা পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আসন্ন কোরবানি উপলক্ষ্যে গরুটি বিক্রির জন্য তাকে ঢাকার বড় পশুর হাটে নেওয়ার জন্যও আমরা পরামর্শ দিয়েছি। আশা করি সে ভালো দাম পাবে।’