পিরোজপুরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৭৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঝালকাঠি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ দৈনিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ৩৪ জন, নাজিরপুরে ১৩ জন, নেছারাবাদে ২২ জন, কাউখালীতে ৪ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৭ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ২ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইন্দুরকানি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। চিকিৎসা শেষে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬৮৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
গত আট মাসের হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৭৬১ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। এছাড়া ভান্ডারিয়ায় ৩২৪ জন, নেছারাবাদে ২৮৮ জন, কাউখালীতে ১২০ জন, নাজিরপুরে ১১৬ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৭৫ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
রোগীর চাপ বাড়ায় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় অনেক ডেঙ্গু রোগীকে সাধারণ রোগীদের পাশেই মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও ভোগান্তি বেড়েছে।
চিকিৎসাধীন রোগী আয়েশা আক্তার বলেন, “চার-পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি। তীব্র দুর্বলতা, ক্লান্তি ও বমিভাব কমছে না। রোগীর চাপ এত বেশি যে ঠিকমতো থাকার জায়গা ও সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি অনেক রোগী নিয়মিত মশারি ব্যবহার করছেন না। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে নার্সদের নির্দেশে কয়েকজন দ্রুত মশারি টাঙান। হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, বারবার সতর্ক করার পরও অনেক রোগী সচেতনতার অভাবে মশারি ব্যবহার করছেন না।
পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, “প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে ৩৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এনএস-১ কিট, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের কোনো সংকট নেই। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।”
এদিকে পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালায়। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, আইইডিসিআরের অনুসন্ধানে সুপারি ও নারিকেল গাছের কাটা গোড়ায় জমে থাকা পানি, নারিকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে বিপুল পরিমাণ এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন এবং বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট মজুত রয়েছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পিরোজপুর পৌরসভা ও জেলা পরিষদ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে। পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান জানান, শহরের নালা-ড্রেনে নিয়মিত মশকনাশক স্প্রে করা হচ্ছে এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, জেলার বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও নালা পরিষ্কারের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জনগণকে বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং দিন-রাত উভয় সময়ই মশারি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য এডিস মশার প্রজননস্থল দ্রুত ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।