, , ,
শিরোনাম
স্ত্রীসহ পরিবারের আট সদস্য হারিয়ে নির্বাক আশিক যশোরে অস্ত্র-গুলিসহ ভ্যানচালক গ্রেপ্তার প্রেমের টানে চীনা যুবক মাদারীপুরে, ধর্মান্তরিত হয়ে করতে চান বিয়ে নলছিটিতে প্রায় সোয়া ৩ কেজি গাঁজাসহ ২ কারবারি আটক দুমকীর স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন কলাপাড়ায় মাদক সেবন ও ঘুঘু-বক শিকারের অপরাধে ২ যুবকের জরিমানা নিরাপত্তার স্বার্থে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত বিমানের রিয়াদগামী ফ্লাইট কাউখালীতে কঁচা নদীতে অভিযান, ৫ হাজার মিটার অবৈধ সুতার জাল জব্দ বরিশালে ৯ কোটি টাকার ‘শান্তি নিবাস’ অবহেলায় নষ্ট: ৩ বছরেও মেলেনি প্রবীণদের ঠাঁই শারদীয় দুর্গোৎসবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানালেন কাজিরহাট থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি
স্ত্রীসহ পরিবারের আট সদস্য হারিয়ে নির্বাক আশিক

স্ত্রীসহ পরিবারের আট সদস্য হারিয়ে নির্বাক আশিক

Reporter
প্রতিবেদক : বার্তা বিভাগ
প্রকাশিত : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলছে রিসোর্ট, চারদিকে কালো ধোঁয়া আর বাঁচার আকুতি। প্রাণ বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত জানালা দিয়ে লাফ দেন আশিকুল ইসলাম আশিক। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলেও রক্ষা করতে পারেননি নিজের প্রিয়জনদের। স্ত্রীসহ তার পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়ে শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন তিনি।

একদিকে স্বজনদের খোঁজে আহাজারি, অন্যদিকে আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার! কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তিন শিশুসহ ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। বাঁশ—কাঠের তৈরি তিনতলা ভবনটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা পর্যটকেরা বিপাকে পড়েন। প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুলতানুল আফরীন জুনাইদের ভাষ্য, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। এ কারণে চলতি বছরের জুন মাসে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। আগেই সতর্ক করার পরও কীভাবে পর্যটকদের আবাসনের ব্যবস্থা চালু ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের খুঁজতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আশিকুল ইসলাম আশিক। রিসোর্টের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ বাঁচাতে জানালা দিয়ে লাফ দেন তিনি। এতে প্রাণে বাঁচলেও স্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে পারেননি।

আশিক জানান, তিনি, তার স্ত্রী ও স্ত্রীর পরিবারের সদস্যসহ মোট নয়জন ওই রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ তিনি হাতে পেয়েছেন। বাকি ছয়জনের সন্ধান না পাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন তিনি।

স্বজনদের হারানোর শোকে কথা বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেন আশিক। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার এই বক্তব্য অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা শোকের গভীরতা তুলে ধরে।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে সাতজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তারা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ এবং ঢাকা জেলা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি দেওয়ান ফয়সলের স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তা।

নাসরিন আক্তার মুক্তা আশুলিয়ার স্বপ্ন বিলাস নামের একটি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। বাকি তিনজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছিল বলে জানা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), আব্দুল মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২) রয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টের মালিক দুইজন। তাদের একজন তানভীর, যিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা; অন্যজন নেওয়াজ, যিনি সাতকানিয়ার বাসিন্দা। সুমন নামে লোহাগাড়ার এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিতে মোট ৮টি কক্ষ ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।

তবে রিসোর্টের মালিক ও ম্যানেজারের কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নাই। অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা কোথায় ছিলেন এবং ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কী অবস্থায় ছিল, তাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

স্থানীয়ভাবে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি এখনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।

সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। এ কারণে চলতি বছরের জুন মাসে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘ভবনটির নিচতলায় রান্নাঘর এবং ওপরের তলাগুলোতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।’

শনিবার সকাল ৭টার দিকে পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি তিনতলা ভবনটিতে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে উখিয়া ও ইনানী ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

এরপর ভবনের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পর্যায়ক্রমে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপ—সহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন শনিবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে নতুন করে চারটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০জন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিসোর্টটিতে পর্যটকদের থাকার জন্য একাধিক কক্ষ ছিল। শুক্রবার রাতে কয়েকটি কক্ষের পর্যটকেরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি কক্ষগুলোতে পর্যটকেরা অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন শনিবার সকালে বিভিন্ন কাজে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান বলে জানা গেছে।

তবে রিসোর্টের কক্ষসংখ্যা নিয়ে তথ্যে কিছুটা অমিল রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে আটটি কক্ষ ছিল। অন্যদিকে পুলিশ সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্যে কক্ষসংখ্যা নয়টি বলা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বক্তব্য অনুযায়ী, অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকার বিষয়ে চলতি বছরের জুনে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। এরপর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন খতিয়ে দেখা জরুরি।

পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি তিনতলা ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সেখানে রান্নাঘর পরিচালনার ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ এবং কর্মীদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি যাচাই করা জরুরি।

অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং দায়দায়িত্ব নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা—ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে ১০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 Raytahost.Com
Design by RaytaHost