বুধবার, ১৫ Jul ২০২৬, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন
একদিকে বাড়ির উঠানে মায়ের নিথর দেহ, অন্যদিকে আগুনে পুড়ছে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন চায়ের দোকান। এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও মায়ের লাশ রেখে আগুন নেভাতে যেতে পারেননি সুরমা বেগম (৩০)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর আকুতি, “মায়ের লাশ রেখে কেমনে এখানে আসি?”
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের লেমুয়া গ্রামের বাসিন্দা সুরমা বেগমের জীবনে সোমবার রাত যেন নিয়ে আসে দ্বিগুণ শোকের বার্তা। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মারা যান তাঁর মা। পরিবারের সদস্যরা যখন শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গভীর রাতে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাঁর চায়ের দোকান।
জানা গেছে, সাত বছর আগে সুরমার বাবা আলমগীর হাওলাদার মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর ছোট একটি চায়ের দোকান খুলে সংসারের হাল ধরেন তিনি। ওই দোকান থেকেই চলত তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ। দোকানটিই ছিল তাঁদের একমাত্র আয়ের উৎস।
সোমবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে লেমুয়া বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক দোকান দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। এ সময় পরিচিতজনদের ফোনে সুরমা জানতে পারেন, তাঁর চায়ের দোকানেও আগুন লেগেছে। কিন্তু মায়ের মরদেহ রেখে ঘটনাস্থলে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না তিনি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মায়ের দাফন শেষে আগুনে পুড়ে যাওয়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুরমা। তিনি বলেন, “মায়ের লাশ রেখে কেমনে এখানে আসি? একদিকে মা চলে গেলেন, অন্যদিকে পুড়ে গেল আমাদের সংসারের একমাত্র সম্বল।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লেমুয়া বাজারের এই অগ্নিকাণ্ডে মুদি, মনোহরী, ফার্মেসি, পোশাক ও জুতার দোকানসহ অন্তত ৪৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে প্রায় ১৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাথরঘাটা, মঠবাড়িয়া ও বামনা স্টেশনের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে অধিকাংশ দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার, পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা এবং পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল।
সরেজমিনে দেখা যায়, লেমুয়া বাজারজুড়ে এখন শুধু পোড়া গন্ধ, ধ্বংসস্তূপ আর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহাজারি। কেউ ছাইয়ের স্তূপে অবশিষ্ট মালামাল খুঁজছেন, আবার কেউ সর্বস্ব হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন।
জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা সম্পন্ন হলে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এক রাতেই মাকে হারানোর শোক আর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন সুরমা বেগম। তাঁর মতো আরও অনেক ব্যবসায়ীর চোখে এখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ছাপ। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।