
বরিশাল সদর উপজেলার ৪ নম্বর শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শামছুল কবিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে ১৩ দফা অভিযোগসহ অনাস্থা প্রস্তাব দিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক নির্বাচিত সদস্য।
জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে সদস্যরা অভিযোগ করেন, প্যানেল চেয়ারম্যান পরিষদের কার্যক্রমে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, সদস্যদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করছেন না এবং পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছেন।
আবেদিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মুন্নার সময় প্রতিটি বাড়িতে হোল্ডিং নম্বর প্লেট স্থাপন করা হলেও বর্তমানে পুনরায় নতুন হোল্ডিং নম্বর প্লেট বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি প্লেটের বিপরীতে ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় সাত হাজার প্লেটের মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়টি তদন্ত করে ওই অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের তহবিলে জমা হয়েছে কি না এবং এ কার্যক্রমের প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল কি না তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সদস্যরা।
এছাড়া ১ শতাংশ কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ গোপনে আত্মসাৎ, সভা ও রেজুলেশনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসঙ্গতি, পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের কাছে উপস্থাপন না করা এবং একক সিদ্ধান্তে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদের সংস্কারের নামে ১ শতাংশ বরাদ্দ থেকে ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান কাজ হয়নি। একই অর্থবছরে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের নামে ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হলেও তা বিতরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের দুটি খেয়াঘাটের ইজারার অর্থ আত্মসাৎ, গত দুই বছর ধরে সদস্যদের সম্মানী ভাতা পরিশোধ না করা, ১ শতাংশ বরাদ্দকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে উপস্থাপন করে অর্থ ব্যয় এবং সদস্যদের অজ্ঞাতে শায়েস্তাবাদ বাজার উন্নয়ন কাজ পরিচালনার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, হিসাব-নিরীক্ষা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শামছুল কবিরের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব কার্যকর করতে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আবেদনকারী সদস্যরা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শামছুল কবিরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে “আল্লাহর নামে” রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া একটি ষাঁড় জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগে শামসুল কবির ফরহাদ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। ওই ঘটনায় বরিশাল সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব হিসেবে তার দলীয় পদ সাময়িক স্থগিত করা হয়। একই ঘটনায় শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহীন খানকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম খান বাপ্পি স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ২৪ এপ্রিল শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের আটহাজার এলাকায় আল্লাহর নামে ছেড়ে দেওয়া একটি ষাঁড় জবাই করে প্রায় ৬০০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে আরেকটি ষাঁড় কিনে এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ষাঁড়টির মালিক সোহেল হাওলাদার কাউনিয়া থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, আল্লাহর নামে ছেড়ে দেওয়া ষাঁড়টির বাজারমূল্য ছিল প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
তৎকালীন বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদা সুলতানা অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শামসুল কবির ফরহাদ সে সময় অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, এলাকাবাসী ষাঁড়টির মূল্য নির্ধারণ করে জবাই করে মাংস বিক্রি করেছে এবং সেই অর্থ দিয়ে আরেকটি ষাঁড় কিনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ঘটনাটি শামসুল কবিরের নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বর্তমান অনাস্থা প্রস্তাবে উত্থাপিত অভিযোগগুলো আবেদনকারী ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের দাবি। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।