
পটুয়াখালীর দুমকীতে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (পবিপ্রবি) কেন্দ্র করে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আবাসিক এলাকা। একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ ও নিচু জমি ভরাট করে গড়ে উঠছে নতুন বসতি। তবে এ সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার আশঙ্কা বাড়ছে আবাসিক এলাকায়। অন্যদিকে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে কাদা ও নোংরা পানিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর ক্রেতা—বিক্রেতাদের। দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো প্রধান ফটক—সংলগ্ন সড়কও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নালা, খাল, ডোবা ও নিচু জমি ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ ভবন নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রাখা হচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী দিনে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
পবিপ্রবি প্রতিষ্ঠার পর গত দুই যুগে দুমকীর জনবসতি ও আবাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা—কর্মচারী, সরকারি জনতা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং আশপাশের এলাকার মানুষ এখানে জমি কিনে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলছেন। তবে দুমকী এখনো পৌরসভার মর্যাদা না পাওয়ায় পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের। উপজেলা শহরের বিসমিল্লাহ সড়ক, মুসলিমপাড়া ও একতা সড়কে নতুন নতুন বাড়িঘর নির্মিত হলেও অধিকাংশ এলাকায় নেই পরিকল্পিত ড্রেন। সড়কের তুলনায় উঁচু করে বসতভিটা নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি কোথায় গিয়ে জমবে, তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিসমিল্লাহ সড়কের বাসিন্দা শওকত হাসান বলেন, তারা যখন বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, তখন এলাকায় অন্য কোনো বাড়িঘর ছিল না। তাদের বাড়ির পানি পাশের জলাশয়ে চলে যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় অনেক ভবন নির্মিত হলেও কেউ ড্রেনের ব্যবস্থা রাখেননি। সবাইকে সম্মিলিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। মুসলিমপাড়ার শাহীন খান বলেন, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তাদের এলাকায় পানির দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পৌরসভা না থাকায় কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই যে যার মতো ভবন নির্মাণ করছেন। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখছেন না।
আবাসিক এলাকার পাশাপাশি ড্রেনেজ সংকটে ভুগছে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র পীরতলা ও নতুন বাজার। পীরতলা বাজারে প্রায় ৫০০টি দোকান রয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত থাকলেও বাজারটিতে নেই পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে বৃষ্টির সময় সড়কে কাদা ও ময়লা জমে চলাচলের পরিবেশ নষ্ট হয়। এতে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ছেন দোকানিরা। বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী মামুন খান বলেন, বাজারের রাস্তার অবস্থা ভালো থাকলেও ড্রেন না থাকায় প্রতি বছর বর্ষায় ময়লা জমে রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। তখন ক্রেতারা বাজারে না ঢুকে অন্য জায়গা থেকে কেনাকাটা করেন। ড্রেন থাকলে পানি নেমে যেত এবং রাস্তা চলাচলের উপযোগী থাকত।
দুমকীর ড্রেনেজ সংকটের আরেকটি দৃশ্যমান উদাহরণ পাবিপ্রবির পুরোনো প্রধান ফটক—সংলগ্ন সড়ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সড়কটির বেহাল অবস্থা দেখছি। সড়কটির একদিকে ভাঙাচোরা অবস্থা, অন্যদিকে নিয়মিত জলাবদ্ধতা। না থাকায় পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। আশপাশে ভবন নির্মাণ হলেও পানি সরানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না।
পাবিপ্রবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ফারুক হোসেন বলেন, অনেকেই মনে করেন, ভবন নির্মাণ করলেই কাজ শেষ। কিন্তু সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রেখে ভবন নির্মাণের কারণে এলাকাটি ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য হলেও, তা আটকে থাকলে বিপর্যয় সৃষ্টি করে—বিষয়টি সবার মাথায় রাখা প্রয়োজন।
দুমকী উপজেলা প্রকৌশলী মঈনুল আজম বলেন, ২০২০ সালে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পরিষদ থেকে পীরতলা খাল পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকার একটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই পথে জমির মালিকরা ড্রেন নির্মাণের জন্য জায়গা দিতে রাজি না হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দিন দিন দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন করে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়ার আগে ড্রেন নির্মাণের জন্য জমি দিতে জমির মালিকদের লিখিত সম্মতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দুমকীর ইউএনও আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের সচেতন হওয়া জরুরি। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে দুমকীর বাসিন্দাদের ব্যাপক দুর্ভোগের মুখে পড়তে হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।