
বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে এক রোগীর স্বজন চরম ভোগান্তি ও দায়িত্বহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন। বাবার বুকের সিটিস্ক্যান করাতে গিয়ে দেখতে পান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীর অদ্ভূত অজুহাত— মেডিকেলের সিটিস্ক্যান কক্ষে দায়িত্বরত কর্মচারী নিজেই মেশিনের ওপর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং দাবি করছেন, তিনি নাকি বুকের সিটিস্ক্যান করতে পারেন না!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়া ও প্রতিবাদের মুখে পরবর্তীতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেন ভুক্তভোগী ‘মো. আব্দুল হামিদ’ নামে একজন ব্যক্তি। শনিবার (০৩ অক্টোবর) বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিটিস্ক্যান রুমের কর্মকর্তা মেশিনের ওপর রেস্ট করতেছেন। তিনি এখন কাজ করতে পারবেন না। কারণ তিনি বুকের সিটিস্ক্যান করতে নাকি পারেন না। আমার প্রশ্ন হলো তাহলে ওনার কাজ কী?’
আব্দুল হামিদের এমন ভিডিও পোস্টের পর নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়। একজন রোগীর জটিল শারীরিক পরীক্ষার জন্য এসে টেকনিশিয়ান বা কর্মচারীর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হওয়ার পর চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। পরের দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রোগীর চেস্ট সিটিস্ক্যান সম্পন্ন করে।
পরবর্তীতে রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল ১০টা ০৪ মিনিটে আব্দুল হামিদ আরেকটি ভিডিও আপডেট দিয়ে লেখেন, ‘অবশেষে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খুব যত্ন সহকারে চেস্ট সিটিস্ক্যান সম্পন্ন করলাম।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আপনি যদি অন্যায় দেখে চুপ থাকেন তাহলে অন্যায়কারী আপনার প্রতি আরও জুলুম করবে। আপনি যদি প্রতিবাদ করেন তাহলে সম্মান ফিরে পাবেন। গতকালকে আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলাম আজকে সম্মানের সঙ্গে আমাদের গ্রহণ করেছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। ধন্যবাদ মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে।’
হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের ইনচার্জ সিনিয়র টেকনোলজিস্ট শাহ জালাল শাহিন বলেন, ‘এটি শনিবারের ঘটনা। মূলত বুকের সিটিস্ক্যান করতে হলে চিকিৎসকের অনুমতি প্রয়োজন। রোগীর স্বজন সেটা না নিয়েই পরীক্ষা করতে এসেছেন। রোববার সকালে তিনি চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে আসার পর বুকের সিটিস্ক্যান করে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, সিটিস্ক্যান মেশিনের ওপরে যিনি ঘুমিয়ে ছিলেন তার নাম ইসমাইল হোসেন এবং তিনি সিনিয়র টেকনিশিয়ান। মূলত তিনি বুঝিয়ে বলতে ভুল করেছেন। রোগীর স্বজনদের এটা বুঝিয়ে বললেই বিষয়টি এতোদূর গড়াতো না। তাছাড়া মেশিনের ওপরে ঘুমানোটাও তিনি ঠিক করেননি।’
হাসপাতালের মুখপাত্র জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. মাজাহারুল রেজওয়ান রেজা বলেন, আমার জানামতে হাসপাতালে শুধু মাথার সিটিস্ক্যান হয়। বুকের এইচআরসিটি করা হয় না। এটা করতে গেলে মেশিনে লোড নিতে পারবে না। ফলে মেশিনটি বিকল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তাই মৌখিকভাবে শুধু মাথার সিটিস্ক্যান করার নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। তবে সিটিস্ক্যান মেশিনের ওপরে ঘুমানোর বিষয়টি অপরাধের।’
শের—ই—বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছি। সিটিস্ক্যান রুম ঘুমানোর জায়গা না। অবশ্যই ওই টেকনিশিয়ান অপরাধ করেছেন। সোমবার তাকে অফিসিয়ালি শোকজ করা হবে। তবে তার আগেই প্রাথমিকভাবে ওই ব্যক্তির বেতন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
বৃষ্টির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার তিনি মারা যান। ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন বৃষ্টি। সেখানে প্রায় ৯ মাস ধরে কাজ করছিলেন তিনি।
রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) সিঁদুর পরা বৃষ্টির নিথর দেহের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায়, মৃত্যুর দিন সকালেও তিনি বি নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন জানিয়ে একটি পোস্ট করেছিলেন। সেখানে একটি ফোন নম্বর দিয়ে রক্তদাতাদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করেছিলেন তিনি।
পরে ওই নম্বরে ফোন করে বৃষ্টির মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বড়বোন। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বোন। আমার বোন আর নাই। ১৬ অক্টোবর বিয়ের দিন ছিল। সব কেনাকাটা শেষ। ডেঙ্গু বোনটাকে কেড়ে নিল।’
বৃষ্টির মৃত্যুর সময়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘১০৮ ডিগ্রি জ্বর উঠে গিয়েছিল। পরে হিট স্ট্রোক হয়। ওই সময় যে ধরনের ম্যানেজমেন্ট দরকার ছিল, সেটি করা হয়নি। ১০—২০ মিনিট আগে শুরু করলে হয়তো বেঁচে যেত।’
গোপালগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করা বৃষ্টির হবু বরের বাড়ি পার্শ্ববর্তী টেকেরহাট এলাকায়। মৃত্যুর পর বৃষ্টিকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে তার বোন বলেন, ‘বোনজামাই ওকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে। ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে আসার পথে ওর শ্বশুর—শাশুড়ি বিয়ের সব জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন। বৃষ্টির চলে যাওয়া আমাদের শত জীবনের শোক হয়ে থাকবে। বিয়ে নিয়ে কত আশা ছিল, কত যে গল্প করত…।’
নার্স হিসেবে কাজের পাশাপাশি রোগীদের প্রতিও বৃষ্টির গভীর মমতা ছিল। তার ফেসবুকের একটি পোস্টে সেই মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনার শিকার এক কিশোরীর আইসিইউতে থাকা অবস্থার ছবি শেয়ার করে নিজের অনুভূতির কথা লিখেছিলেন বৃষ্টি।
ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘কতখানি বিশ্বাস, ভরসা আর ভালোবাসা। মেয়েটার বয়স বেশি না, আমার মিষ্টুর বয়সি। মারাত্মক দুর্ঘটনার থেকে কোনোমতে জান বেঁচে ফিরেছে, জাস্ট কোনোমতে। এত বড় দুর্ঘটনা থেকে সুস্থ হতে ওর কয়েক মাস আবার বছরও লেগে যেতে পারেৃ। কী সুন্দর করে আপু বলে ডাক দেয়, ওর জন্য ভীষণ মায়া লাগে। আজ ডিউটি শেষ করে আসার সময় বলতেছিল তুমি যেও না, তুমি অনেক ভালো, আমায় কতো ভালোবাসো, তুমি আমার সাথে আমার বাড়ি যাবে। অনেক জোরাজোরির পর, আর কালকে খুব সকালে যাওয়ার প্রমিস করে তবে আমায় আসতে দিয়েছে। এইটা সবাই বোঝে না শুধু নার্স আর রোগীর একান্ত মধ্যকার আলাপ—আলোচনা।’
বিয়ের স্বপ্ন, নতুন জীবনের প্রস্তুতি আর প্রিয়জনদের ঘিরে থাকা সব আয়োজন শেষ পর্যন্ত থেমে গেছে বৃষ্টির আকস্মিক মৃত্যুতে। তবে শেষ বিদায়ের আগে হবু বরের সিঁদুর পরিয়ে দেওয়া মুহূর্তটি পরিবারের কাছে হয়ে থাকল অপূর্ণ বিয়ের এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।