
ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে শিক্ষক বদলি ঘিরে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা নবম গ্রেডের কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদারের বিরুদ্ধে। সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও দুই শিক্ষিকার পারস্পরিক বদলির আদেশ জারি, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বদলি সম্পন্ন এবং পরবর্তী সময়ে আদেশ বাতিলের আশ্বাস দিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কার্যক্রম। অভিযোগের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষা বিভাগে জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে।
সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে শিক্ষক বদলি করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের বিরুদ্ধেই যদি নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি করবে কে? ঝালকাঠির এই ঘটনা এখন সেই প্রশ্নেরই জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরও বাড়বে।
শূন্যপদ নেই, তবু বদলির আদেশ!
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠি সদরের কুতুবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শামীমা খান এবং সংগ্রামনীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সাবিহা জাহান বর্নার মধ্যে পারস্পরিক বদলির আদেশ জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই দুই বিদ্যালয়ের কোনোটিতেই সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য ছিল না।
যদি এ তথ্য নথিপত্রে প্রমাণিত হয়, তাহলে বদলির সিদ্ধান্ত কোন বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে পদসংক্রান্ত শর্ত, প্রযোজ্য নীতিমালা এবং অনুমোদিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত অনলাইন ব্যবস্থার পরিবর্তে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে এই বদলি সম্পন্ন করা হয়। পরে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতি IPEMIS-এ শিক্ষক বদলি নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বদলি বাতিলের জন্য আবেদন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এখানেই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বদলির আবেদন কে প্রস্তুত করেছেন, আদেশ জারির অনুমোদন কে দিয়েছেন, কোন নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিধিমালা সম্পর্কে অবগত ছিলেন কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ঘটনাটিকে সাধারণ প্রশাসনিক ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদারের বিরুদ্ধে বদলির বিনিময়ে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষিকা শামীমা খানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এই বদলির ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শামীমা খান ও তাঁর স্বামী সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম মিলে সংগ্রামনীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সাবিহা জাহান বর্নাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বদলির আবেদনে স্বাক্ষর করান। পরে ওই আবেদনের ভিত্তিতে বদলির আদেশ জারি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার পর বদলির আদেশ বাতিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই আবেদনের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলাম মজুমদার জানিয়েছেন, অনিয়মের মাধ্যমে এমন বদলির ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন এবং বদলিটি বাতিল করা হবে।
কিন্তু বাতিলের আশ্বাসের পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আদেশটি বাতিল হয়ে থাকলে তার লিখিত প্রমাণ কোথায়? আর বাতিল না হয়ে থাকলে বিলম্বের কারণ কী? সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বর্তমানে কোন বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন এবং IPEMIS-এ তাঁদের বদলি-সংক্রান্ত তথ্যের অবস্থা কী, তাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদলিটিকে ভুল বলে স্বীকার করার পরও আদেশ বাতিলের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করছেন। একই সঙ্গে সফটওয়্যারে বদলি কার্যকরের চেষ্টা অব্যাহত রাখার অভিযোগও উঠেছে।
যদি কোনো কর্মকর্তা নিজেই কোনো আদেশকে ভুল বলে স্বীকার করে থাকেন, তাহলে সেই আদেশ সংশোধনের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিলম্বের ব্যাখ্যা দেওয়া তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। মুখে ভুল স্বীকার আর বাস্তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এক বিষয় নয়। সরকারি দপ্তরে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লিখিত আদেশ ও তার বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বদলিটি ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, মিউচুয়াল বদলি নিয়ে তাঁর ভুল হয়েছে এবং এ কাজে অফিসের অন্যরাও জড়িত ছিলেন।
এই বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন। অফিসের অন্যরা জড়িত থাকলে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, কারা বদলির প্রস্তাব তৈরি করেছিলেন, কে অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং কোন বিধির ভিত্তিতে আদেশ জারি করা হয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।
একটি সরকারি দপ্তরে কোনো অনিয়ম সংঘটিত হলে শুধু একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে দায়ী করে তদন্ত শেষ করা যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি।
বরিশরে একাধিক ফ্ল্যাটের অভিযোগ, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন?
শিক্ষক বদলি-সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদারের সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, বরিশাল শহরের বৌদ্ধপাড়া এলাকায় মেগা হেরিটাস নামের দশতলা ভবনে তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের পরিমাণ, ক্রয়মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে তা নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা যেতে পারে।
ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে বদলি বাতিলের আশ্বাস দেওয়া হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, তদন্তের অগ্রগতি এবং দায় নির্ধারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
প্রথমত, দুই বিদ্যালয়ের অনুমোদিত পদসংখ্যা ও শূন্যপদের তথ্য যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বদলির আবেদন, অনুমোদন এবং আদেশ জারির নথি পরীক্ষা করতে হবে। তৃতীয়ত, IPEMIS-এ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বদলি-সংক্রান্ত রেকর্ড পর্যালোচনা করতে হবে। চতুর্থত, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহলের পক্ষ থেকে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অনিয়ম প্রমাণিত হলে বদলি আদেশ বাতিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ যেন তৈরি না হয়।
শিক্ষক বদলি নিয়ে ওঠা এই অভিযোগ কেবল একটি আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক, তারও পরীক্ষা। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সেটিও যথাযথ তদন্তের ভিত্তিতে স্পষ্ট করা উচিত।
ঝালকাঠির শিক্ষক বদলি বিতর্কে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, অভিযোগের নিষ্পত্তি মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে লিখিত সিদ্ধান্ত, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
সরকারি বিধিমালা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তাই শিক্ষক বদলির এই ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।