
বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে ১৬ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়ক নির্মাণকাজের শেষ পর্যায়ে এসে ঢালাই বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কাজের মান নিয়ে আপত্তি তুলে সোমবার (২৬ অক্টোবর) নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতা—কর্মীরা। এর আগে রোববার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাবঠিকাদারকে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অহনা এন্টারপ্রাইজের সাবঠিকাদার সাদ রহমানের অভিযোগ, নির্মাণকাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আপত্তি না থাকলেও কাজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কয়েকজন শিক্ষার্থীও দাবি করেছেন, সড়ক নির্মাণকাজ স্বচ্ছভাবে চলছিল। তাঁদের অভিযোগ, কাজ না পাওয়াকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদল নেতারা জোরপূর্বক নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাদ রহমানের অভিযোগ অনুযায়ী, রোববার মুঠোফোনে কথা বলার সময় হুমায়ুন কবির তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুই কি নেতা—খাতা হয়ে গেছিস? তোর কি টাকা বেশি হয়ে গেছে? তুমি বিএম কলেজে কাজ করতে যাও কেন? তুমি বিএম কলেজের কে? তুই দলেরই বা কী? তুই কি দলবাজ হয়ে গেছিস?’
এ সময় হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ‘তুই কি জানিস, আমি ওই কাজের পেছনে ছয় মাস ধরে ঘুরি। তুই বয়সে ছোট। তুই যদি আমার সমবয়সী হতি, তোর টাকা কোথা দিয়ে বের হয়, দেখতাম আমি।’
তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে অভিযুক্ত হুমায়ুন কবিরের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যায়ে এসে বন্ধ নির্মাণকাজ
ছাত্রাবাসের প্রায় ৪৫০ ফুট সড়ক নির্মাণকাজের শেষ পর্যায়ে মাত্র ৩০ ফুট অংশের ঢালাই বাকি ছিল। সোমবার সন্ধ্যায় অশ্বিনী কুমার ছাত্রাবাসের সড়কে ওই অংশের ঢালাই চলাকালে কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম জুবায়ের ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে নেতা—কর্মীরা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ করেন সাবঠিকাদার সাদ রহমান।
সাদ রহমানের দাবি, নির্মাণকাজ পরিদর্শন করে কলেজের অধ্যক্ষ, প্রকৌশলী ও হল সুপার সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। এ সময় এক প্রকৌশলীর সহকারীর গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিএম কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম জুবায়ের দাবি করেন, সড়ক নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান বজায় রাখছে না এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। বালু ফেলার সাত দিনও অপেক্ষা না করে ঢালাই দেওয়া হচ্ছিল—এমন অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা কাজ বন্ধ করেছেন বলে জানান তিনি।
তবে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য, নির্মাণকাজ স্বচ্ছভাবে চলছিল। তাঁদের অভিযোগ, কাজের বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদল নেতারা জোরপূর্বক কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্মাণকাজের মান নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, বালু ফেলার কত দিন পর ঢালাই দিতে হবে, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। বালু যথাযথভাবে বসেছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি কলেজের অধ্যক্ষকে জানানো হয়েছে।
মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি এনামুল হক তাসনিম বলেন, কাজটির দরপত্র অনেক আগে হয়েছে। ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্য হলো, নির্মাণকাজে ত্রুটি রয়েছে এবং দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
ছাত্রাবাসের হল সুপার এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, ছাত্রদলের নেতা—কর্মীরা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রকৌশলীদের অনুমতি নিয়েই ঠিকাদার কাজ করছিলেন এবং তাঁর কাছে কাজটি সঠিক মনে হয়েছে। তিনি বলেন, কাজ বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে, কারণ ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়।
সাংবাদিক পরিচয়ে কাজ বন্ধের অভিযোগ
এদিকে, মারুফ নামের এক যুবক নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে যান বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার। ওই ঘটনার ভিডিও স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা ধারণ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ঠিকাদারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, মারুফের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা সাদিক আবদুল্লাহর স্ত্রী লিপি আবদুল্লাহর ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়সহ একাধিক ছবি রয়েছে। তবে এসব ছবি কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে নির্মাণকাজ বন্ধের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কাজী জাবের আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বিএম কলেজের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। এ ঘটনায় কেউ অভিযোগও করেননি।
১৬ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সড়কটির শেষ পর্যায়ের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্মাণকাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কাজটি দ্রুত শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।