শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ০৬:৩২ অপরাহ্ন

চরফ্যাশনে ডা. আঁখির ‘মৃত্যুফাঁদ’ ভূল চিকিৎসায় ৫ জনের মৃত্যু

চরফ্যাশনে ডা. আঁখির ‘মৃত্যুফাঁদ’ ভূল চিকিৎসায় ৫ জনের মৃত্যু

ভোলার চরফ্যাশনে চিকিৎসার নামে চলছে ভয়ংকর ‘মরণযজ্ঞ’। সেবার আড়ালে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন ডা. আঁখি আক্তার নামের এক চিকিৎসক। যার অবহেলা আর ভুল চিকিৎসায় গত কয়েক বছরে অন্তত পাঁচজন প্রসূতি ও নবজাতকের প্রাণ গেছে।

সর্বশেষ গত বুধবার (৬ মে) জান্নাত (২৫) নামের এক প্রসূতির করুণ মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছে চরফ্যাশন। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বারবার পার পেয়ে যাওয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এই চিকিৎসক, যাকে স্থানীয়রা এখন ক্ষোভের সাথে ‘কসাই’ বলে ডাকছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বুধবার দুপুরে প্রসব বেদনা নিয়ে আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কাশেম খন্দকারের স্ত্রী জান্নাতকে ইকরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করা হয়। ডা. আঁখি তাকে স্বাভাবিক প্রসবের আশ্বাস দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের দাবি, রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হলেও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাকে রেফার না করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। মূলত অধিক মুনাফার লোভে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নষ্ট করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত গর্ভে সন্তান রেখেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন জান্নাত।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডা. আঁখির ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার ইতিহাস শুধু দীর্ঘই নয়, বরং শিউরে ওঠার মতো। গত কয়েক বছরে তার হাতে একে একে ঝরে গেছে পাঁচটি প্রাণ। গত ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইকরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডা. আঁখির অনুপস্থিতিতেই এক নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ক্লিনিকে সশরীরে উপস্থিত না থেকে মুঠোফোনে অদক্ষ নার্স ও আয়াদের নির্দেশনা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব কার্য পরিচালনা করেন। শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার না করে ক্লিনিকে আটকে রাখা হয়, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এর আগে ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেন্ট্রাল ইউনাইটেড হাসপাতালে মুন্নী আক্তার নামে এক প্রসূতি ডা. আঁখির ভুল চিকিৎসার বলি হন বলে তার পরিবার দাবি করে। এছাড়া দুলারহাট এলাকার আরও এক প্রসূতি এবং ২০২২ সালে একই প্রতিষ্ঠানে আরও দুই নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ডা. আঁখির নাম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রোগীর শারীরিক জটিলতাকে তোয়াক্কা না করে ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডা. আঁখির নিয়ন্ত্রণাধীন বা তার সাথে চুক্তিবদ্ধ ক্লিনিকগুলোতে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের বালাই নেই। ডেলিভারির মতো স্পর্শকাতর কাজগুলো সম্পন্ন করেন অদক্ষ আয়া ও নার্সরা। ডা. আঁখি অনেক সময় উপস্থিত না থেকে মুঠোফোনে নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। সংকটাপন্ন রোগীদের আটকে রেখে অর্থ আদায় করা এই চক্রের নিয়মিত কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি মৃত্যুর পর লোকদেখানো তদন্ত কমিটি গঠন হয় এবং ক্লিনিক সাময়িক সিলগালা করা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সব ধামাচাপা পড়ে যায়। ডা. আঁখি পুনরায় ভিন্ন নামে বা ভিন্ন ক্লিনিকে তার ‘মরণখেলা’ শুরু করেন। এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায়— তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে ডা. আঁখি আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

তবে ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মু: মনিরুল ইসলাম এবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভিকটিম চাইলে থানায় মামলা দায়ের অথবা লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে পারে। যত আইনি সহযোগিতা লাগে তা আমরা করবো। যেহেতু ডা. আঁখির বিরুদ্ধে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, একটা তদন্ত কমিটি করে দেখবো। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যদি ডা. আঁখির অনিয়ম উঠে আসে তাহলে তার নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রতিবেদন পাঠাবো।’

চরফ্যাশনের সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের দাবি, শুধু ক্লিনিক সিলগালা বা তদন্ত কমিটি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। চিকিৎসা পেশার পবিত্রতা নষ্ট করা এই চিকিৎসকের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল এবং তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই ‘চিকিৎসা বাণিজ্যের’ বলি হয়ে আরও অনেক মায়ের কোল খালি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2019 Raytahost.Com
Design by RaytaHost