মঙ্গলবার, ৩০ Jun ২০২৬, ০১:৪৯ পূর্বাহ্ন
বরিশালে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অব্যবস্থাপনা, বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি সময় পেলেই স্ত্রী লামিয়ার কবরের পাশে স্থির হয়ে বসে থাকেন মোহাম্মদ শরীফ। যে ছেলেটি বড় হয়ে উঠছে, সে কোনোদিন তার মাকে দেখতে পাবে না—এই ভাবনা এলেই বুকটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে। একসময় সুন্দর সংসার ছিল শরীফের। কিন্তু ভুল চিকিৎসার অভিযোগে সেই সংসার আজ তছনছ হয়ে গেছে।
ভোলার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধন হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ভর্তি করানোর পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্ত্রীকে হারান তিনি। মোহাম্মদ শরীফ বলেন, গত ৭ জানুয়ারি আমার স্ত্রীকে ক্লিনিকে ভর্তি করাই।৮ জানুয়ারি সিজারের মাধ্যমে আমাদের পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। অপারেশনের পরপরই ‘ও’ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন বলে জানায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। আমরা দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করি। তখনও আমার স্ত্রী সুস্থ ছিলেন। কিন্তু ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রক্তের ক্রসম্যাচ না করেই তা শরীরে পুশ করে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আপত্তি জানালে তারা বলেন, কোনো সমস্যা হবে না। কিছুক্ষণ পরই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে বরিশাল শের—ই—বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সেখানে চিকিৎসকরা জানান, ভুল রক্ত দেওয়ায় রক্তকণিকা ভেঙে গেছে। ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় লামিয়া মারা যান। তিনি আরও বলেন, আইনি জটিলতার কারণে মামলা করিনি। বিচার পাব না বলেই বিশ্বাস করি। কারণ দেশে ভুল চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার হয়। সেই ক্লিনিক এখনও চালু আছে। শুধু আমার স্ত্রীই নেই, আমার সংসারটাই ভেঙে গেছে। আমরা মানসম্মত সেবার পক্ষে।
আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় নগরীর প্রায় ৬০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক রয়েছে। এর বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বরিশাল ক্লিনিক—ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম শহিদুল্লাহ শুধু শরীফ নন, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসা অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চিকিৎসকের অবহেলায় তামান্না বেগম (২৫) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি বাবুগঞ্জের হালিমা—মান্নান মেমোরিয়াল ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসার শিকার হন গৌরনদীর বাসিন্দা রাজীব খলিফা।
এছাড়া ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বরিশাল নগরীর রাহাত—আনোয়ার হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ছয় মাস বয়সী শিশু তানজিম ইসলামের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে যুবদল নেতা মনির খানের (৩৮) মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন।
গত ১০ জুন দুপুরে নগরীর বাজার রোড এলাকার কেএমসি হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। মনির খান বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের উত্তর বাহেরচর গ্রামের আব্দুল হক খানের ছেলে এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এদিকে চিকিৎসা অবহেলা ও মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে এমন অধিকাংশ বেসরকারি ক্লিনিকই সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’— এই তিন ক্যাটাগরিতে অনুমোদন দেওয়া হয়। বরিশাল নগরীতে অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৩৮টি। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৪টি, ‘বি’ ক্যাটাগরির ২৫টি এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির ৯৯টি। এছাড়া নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে ৪৩টি। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। নগরীতে দুই শতাধিক ক্লিনিক—ডায়াগনস্টিক সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বরিশাল ক্লিনিক—ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম শহিদুল্লাহ বলেন, বিগত সরকারের আমলে সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর খামখেয়ালিপনার কারণে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিবন্ধন পায়নি। ট্রেড লাইসেন্স পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতো। স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্সের বিষয়েও হস্তক্ষেপ ছিল। আমরা মানসম্মত সেবার পক্ষে। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় নগরীর প্রায় ৬০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক রয়েছে। এর বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিছু অসাধু মালিক ও দালালের কারণে পুরো খাতের বদনাম হচ্ছে। আমরা অবৈধ ক্লিনিক বন্ধে নিয়মিত অভিযানের দাবি জানিয়ে আসছি। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম শহিদুল্লাহর নিজ প্রতিষ্ঠান ইসলামিয়া ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার দীর্ঘ ছয় বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হওয়ার তথ্য সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে উঠে আসে। অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সম্প্রতি এক নারী ভুল চিকিৎসার অভিযোগ নিয়ে আসে।
একদিন পর আবার সে তার অভিযোগটি তুলে নিয়ে যায়। গত ২৮ এপ্রিল শের—ই—বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন বান্দ রোড এলাকায় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে আটটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
এ সময় মেয়াদোত্তীর্ণ কিট ব্যবহার, প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা এবং পরীক্ষার আগেই রিপোর্ট প্রস্তুতের মতো অনিয়মের অভিযোগে আট প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জরিমানা দেওয়ার পরও এসব প্রতিষ্ঠান বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নগরীর বগুড়া রোডের পুরাতন অপসোনিন মোড় এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে কথা হয় মমতাজ বেগমের সঙ্গে।
বানারীপাড়া উপজেলার সৈয়দকাঠি থেকে মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। মমতাজ বেগম বলেন, নথুল্লাবাদে বাস থেকে নামার পর এক ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক আমাদের এখানে নিয়ে আসে। সে বলে সদর হাসপাতালের ডাক্তার—নার্সরা আন্দোলন করছে, তাই হাসপাতাল বন্ধ। এখানে নাকি ভালো ডাক্তার পাওয়া যাবে। কিন্তু দুই সিরিঞ্জ রক্ত নিয়ে ৮ হাজার টাকা নিয়েছে। কোনো ডাক্তারই দেখিনি। একটি ক্লিনিকের সাবেক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বরিশালের বৈধ—অবৈধ প্রায় সব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই দালাল চক্র রয়েছে। কেউ বাস টার্মিনালে, কেউ হাসপাতালে, আবার কেউ সদর রোড এলাকায় রোগী সংগ্রহ করে।
অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে কর্মচারীরাই রিপোর্ট তৈরি করে। দালাল হিসেবে কাজ করা এক থ্রি—হুইলার চালক বলেন, বাটারগলি, বেলভিউ গলি, বিবির পুকুরপাড়, সদর হাসপাতাল ও শের—ই—বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় অন্তত দেড়শ দালাল কাজ করে। তাদের কাজই সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া। বিনিময়ে কমিশন দেয় ক্লিনিকগুলো।
তিনি জানান, রোগী সংগ্রহ করে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রুবেল নামে এক যুবকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি নিজেকে একটি ক্লিনিকের কর্মী পরিচয় দিয়ে বলেন, আমাদের ক্লিনিকের ছয়জন কর্মী রোস্টার করে হাসপাতালে অবস্থান করি। যে বেশি রোগী নিতে পারে, সে বেশি টাকা পায়।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর—এ—এলাহী বলেন, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর আমাদের নজরদারি রয়েছে। বিশেষ করে নগরীর প্রতিষ্ঠানগুলো বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে নিয়মিত তদারকি করা হয়। ভুল চিকিৎসার প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়। নিবন্ধনের বাইরে কোনো ক্লিনিক পরিচালনার সুযোগ নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. লোকমান হাকিম বলেন, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এ ধরনের অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক এক নারী ভুল চিকিৎসার অভিযোগ নিয়ে আসে। একদিন পর আবার সে তার অভিযোগটি তুলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখনও শয্যা সংকট রয়েছে। ধীরে ধীরে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শয্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বরিশাল শের—ই—বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।
ডা. লোকমান হাকিম আরও বলেন, যেসব বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারবে না, তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না। দালাল চক্র ও অব্যবস্থাপনা রোধে আমাদের নজরদারি টিম কাজ করছে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই।