, , ,
শিরোনাম
ভূমি সেবায় আস্থা ফেরানো এসিল্যান্ড মহেশ্বর মন্ডলের বদলি, হতাশ উজিরপুরবাসী সরকার ছয় মাসের মধ্যেই লাইনচ্যুত হয়ে গেছে: সারজিস আলম নেছারাবাদে সমবায় সমিতির নামে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, সাজাপ্রাপ্ত বিশ্বজিৎ গ্রেপ্তার কুয়াকাটায় ২০ দোকানে তালা: জমি বিরোধের আড়ালে দখলের লড়াই, প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক প্রভাব অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা হচ্ছে, থাকবে কিউআর কোড ও রুট নির্ধারণ পিরোজপুরে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় ৭ বছরের কারাদণ্ড এআই দিয়ে ভুয়া র‍্যাব কর্মকর্তা সেজে কিশোরীকে ‘ধর্ষণ’, যুবক গ্রেফতার সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেমিনার অনুষ্ঠিত পিরোজপুরে অস্ত্র, গুলি ও গাঁজাসহ একাধিক মামলার আসামি গ্রেফতার ববি ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে বাড়ি ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগ
কুয়াকাটায় ২০ দোকানে তালা: জমি বিরোধের আড়ালে দখলের লড়াই, প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক প্রভাব

কুয়াকাটায় ২০ দোকানে তালা: জমি বিরোধের আড়ালে দখলের লড়াই, প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক প্রভাব

Reporter
প্রতিবেদক : অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত : সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পর্যটননগরী কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট। পর্যটকদের আনাগোনায় মুখর এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হঠাৎ করেই ২০টি দোকানে ঝুলছে তালা। দোকানের সামনে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে পড়ে আছে ব্যবসায়ীদের মালামাল। কয়েকজন ব্যবসায়ী মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।

ঘটনার নেপথ্যে জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা বলা হলেও, প্রকাশ্যে দোকান উচ্ছেদ, মালামাল বাইরে ফেলে দেওয়া এবং তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আইনগত বিরোধের সমাধান কি আদালত ও প্রশাসনের মাধ্যমে হওয়ার কথা নয়? তাহলে কার নির্দেশে এবং কীভাবে একটি দল দোকানিদের সরিয়ে দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিল?

রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে কুয়াকাটার আচার, ঝিনুক ও শুঁটকি মার্কেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

১৫০—২০০ জনের দল, তারপরই দোকানে তালা-ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসুল্লি ও তাঁর ছেলে রিয়াজ মুসুল্লির নেতৃত্বে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনের একটি দল মার্কেট এলাকায় যায়। তাঁরা ব্যবসায়ীদের দোকান থেকে বের করে দেন। এরপর দোকানের মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে একে একে প্রায় ২০টি দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটি শুধু দোকান বন্ধ করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পুলিশকে খবর দেওয়ায় কয়েকজনকে মারধরও করা হয়েছে।

যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার না করে আজিজ মুসুল্লি জমিটির মালিকানা নিজের বলে দাবি করেছেন এবং তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে অন্যরা জমিটি দখল করে রেখেছিল।

এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলে আদালতের রায় কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই দোকান উচ্ছেদ ও তালাবদ্ধ করার আইনগত ভিত্তি কী?

‘২০১৮ সাল থেকে ব্যবসা করছি’, এখন দোকানেই তালা-শুঁটকি ব্যবসায়ী রুবেল মৃধা বলেন, ২০১৮ সাল থেকে তিনি সেখানে ব্যবসা করছেন। তাঁর অভিযোগ, সকালে হঠাৎ অনেক লোক এসে দোকান ছেড়ে দিতে বলেন। পরে তাঁর দোকানের মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

আরেক ব্যবসায়ী মনির হোসেনের অভিযোগ, পুলিশের কাছে খবর দেওয়ার কারণে তাঁকে মারধর করা হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ দেখে তিনি দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নেন।

আচার ব্যবসায়ী মো. মহিবুল্লাহর প্রশ্ন আরও সরাসরি—“জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটি আইনগতভাবে সমাধান হতে পারে। কিন্তু আমাদের দোকান থেকে বের করে দিয়ে তালা দেওয়া হয়েছে। এতে আমরা ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছি।”

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। অর্থাৎ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও সেখানে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়।

ঘটনার একপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের কেউ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আইনি সহায়তা চান। পরে মহিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পুলিশকে খবর দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ানুল ইসলাম রাসেলসহ অন্যরা কয়েকজন ব্যবসায়ীকে মারধর করেন।

তবে পুলিশ বলছে, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছে।

মহিপুর থানার উপপরিদর্শক মো. জাকির হোসেন বলেন, ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ব্যবসায়ীদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

জমির মালিকানা দাবি করা বেল্লাল মোল্লার বক্তব্যে উঠে এসেছে বিরোধের আরেকটি দিক। তাঁর দাবি, জমিটি দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দখলে রয়েছে এবং এ নিয়ে পটুয়াখালীর আদালতে মামলা চলছে।

তিনি জানান, এর আগেও দোকানগুলোতে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে দোকান খুলে দেওয়া হয়। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে দাবি তাঁর।

অর্থাৎ একই জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা, প্রশাসনের কাছে অভিযোগ এবং এর মধ্যে একাধিকবার দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই অমীমাংসিত।

দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসুল্লি বলেন,

“দখল করবে, করবে না—তাইলে কী করবে। এই জমি আমার, গত ১৭ বছর বারেক মোল্লা দখল করে রেখেছে। এই জমির দলিলও আমার নামে।”

প্রশাসনের মাধ্যমে না গিয়ে প্রকাশ্যে দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৫ তারিখের পর তিনি এসিল্যান্ডের কাছে গিয়েছেন, সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের ডেকেছেন। কিন্তু তাঁরা আসেননি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তাঁকে এভাবে করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে তাঁর এই বক্তব্যই নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে—কোনো জমির মালিকানা নিয়ে প্রশাসনিক বা আদালতীয় বিরোধ থাকলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে লোকজন নিয়ে গিয়ে দখল নেওয়া বা দোকানে তালা দেওয়ার সুযোগ আছে কি না?

 

এ ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী হুমায়ুন সিকদার স্বীকার করেছেন যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, জমিটি লুজ খতিয়ানের হওয়ায় বিরোধ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। কাগজপত্র অনুযায়ী উভয় পক্ষকে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সেখানে পুনরায় দখল ও দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট—বিরোধটি নতুন নয়, আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পর্যায়েও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন সংশ্লিষ্টরা।

পটুয়াখালী—৪ (কলাপাড়া—রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের বক্তব্যে বিরোধের ভৌগোলিক ও বাস্তব জটিলতাও সামনে এসেছে।

তিনি বলেন, ওই এলাকায় উভয় পক্ষের জমি ছিল। সাগরে জমি বিলীন হওয়ার সময় একাধিক ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তাঁর মতে, যেহেতু সেখানে জমি নেই, তাই বিষয়টির সমাধান জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর দাবি, এখানে দলীয় পরিচয়ের কারণে নয়, বরং মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণেই ঝামেলা হয়েছে।

কুয়াকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা প্রায় ২০ জন ব্যবসায়ী একদিনে দোকান হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। জমির প্রকৃত মালিক কে—সেটি আদালত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারণের বিষয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ করে দেওয়া এবং মালামাল বাইরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 Raytahost.Com
Design by RaytaHost