
পিরোজপুরের নেছারাবাদে সমবায় সমিতির নামে সাধারণ মানুষের জমা রাখা প্রায় ১০০ কোটি টাকা নিয়ে আত্মগোপনে থাকা বিশ্বজিৎ হালদার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার দিবাগত রাতে উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের কটুরাকাঠি এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত বিশ্বজিৎ হালদারের বিরুদ্ধে আদালত থেকে পূর্বে ঘোষিত পাঁচটি মামলায় সাজা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তিনি আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের বিমল চন্দ্র হালদারের ছেলে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমবায় সমিতির লাইসেন্স নিয়ে বিশ্বজিৎ হালদার এনজিওর আদলে একটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন মেয়াদে আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি পাঁচ থেকে ছয় বছরে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের বড় একটি অংশ ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বছরের পর বছর আমানত জমা দেওয়ার পর ২০২৩ সালে হঠাৎ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেন বিশ্বজিৎ। এরপর থেকেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ।
আমানতকারীদের দাবি, নেছারাবাদ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠানটির ১০ থেকে ১২টি শাখা ছিল। এসব শাখার মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নাজিরপুর ও ঝালকাঠি এলাকাতেও একাধিক শাখা চালু করে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা।
তবে প্রতিষ্ঠানটির মোট আমানতের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কত এবং কতজন গ্রাহকের কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল—তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় মাঠকর্মী অঞ্জু রানী ফোনে জানান, শুধু ভরতকাঠি এলাকাতেই প্রায় তিন হাজার মানুষের আনুমানিক ছয় থেকে সাত কোটি টাকা ওই সমিতিতে জমা রয়েছে বলে তিনি জানেন।
অঞ্জু রানী বলেন, তাঁর দায়িত্ব ছিল ঋণ বিতরণ ও কিস্তি আদায় করা। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার পর বিপুল পরিমাণ আমানত হারিয়ে অনেক গ্রাহক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ কারণে হয়রানির আশঙ্কায় তিনি এলাকা ছেড়ে দূরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান।
সমিতিতে আমানত রেখে প্রতারিত হওয়া বিনয় ভূষণ নামে এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর পরিবারের দাবি, তাঁদের প্রায় ২০ লাখ টাকা ওই প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার পর সেই টাকা আর ফেরত পাননি তাঁরা।
একইভাবে নেছারাবাদের কাটা দৈহারী গ্রামের বাসিন্দা শামসুর রহমান প্রায় ১৫ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন বলে জানান। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর আমানতের টাকা ফেরত পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
এভাবে বড় অঙ্কের সঞ্চয় হারিয়ে অনেক পরিবার এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নিয়মিত আমানত সংগ্রহের পর ২০২৩ সালে হঠাৎ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিশ্বজিৎ হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন গ্রাহকেরা। একপর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং আদালত থেকে সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
প্রায় তিন বছর পর নিজ বাড়ি থেকে তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনায় আমানতকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে তাঁদের মূল প্রশ্ন এখন—হাজার হাজার মানুষের জমা করা বিপুল পরিমাণ টাকা কোথায় গেল?
বিশ্বজিৎ গ্রেপ্তার হলেও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা এখনো নেই। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করল, কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে অর্থ ও সম্পদের কী অবস্থা—এসব বিষয় তদন্ত করে বের করা জরুরি।
অপরাধের বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটনে বিশ্বজিৎ হালদারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবিও জানিয়েছেন প্রতারিত গ্রাহকেরা।
নেছারাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান জানান, গ্রেপ্তারকৃত বিশ্বজিৎ হালদারকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে আগের একাধিক মামলায় সাজার পরোয়ানা রয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রায় ১০০ কোটি টাকা আমানত নিয়ে আত্মগোপনের অভিযোগ এবং অর্থের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো জানানো হয়নি।
বিশ্বজিৎ হালদারের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় থাকা আমানতকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হলেও, প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা এই বিপুল অর্থের প্রকৃত হিসাব, গন্তব্য এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর কতটা বেরিয়ে আসে, সেটিই দেখার বিষয়।