
কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে ন্যূনতম সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এক নিরীহ বিক্রয়কর্মীকে পরিকল্পিতভাবে “নিষিদ্ধ আ.লীগের সক্রিয় সদস্য” সাজিয়ে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা একটি রাজনৈতিক মামলায় ওই যুবককে ২৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে। ভুক্তভোগী যুবকের নাম সৈয়দ আমিনুল ইসলাম ওরফে নয়ন (২৮)। তিনি বরিশাল সদর উপজেলার ১ নম্বর রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ কড়াপুর গ্রামের সৈয়দ আবুল হোসেনের ছেলে। পরিবারের দাবি, যৌথ পরিবারের জমির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে নয়নের দাদার ওয়ারিশদের একজন এই চক্রান্তের নেপথ্যে রয়েছেন।
স্থানীয় ও থানা সূত্র এবং ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নয়ন ‘মেরিডিয়ান’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মী (সেলসম্যান) হিসেবে কর্মরত। এর পূর্বে তিনি কড়াপুর ইউনিয়নের যাত্রাবাড়ী সংলগ্ন এলাকায় একটি ছোট ফ্লেক্সিলোডের দোকান পরিচালনা করতেন। এলাকায় সাধারণ ও শান্তপ্রিয় যুবক হিসেবেই তিনি পরিচিত। কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিল-সমাবেশ বা কর্মসূচির সাথে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং নেই বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সৈয়দ রহুল আমিন বাচ্চু, মো. হাসনায়িন মিশুক, মো. কবির, মোসা. মরিয়ম বেগমসহ প্রায় অর্ধশত বাসিন্দা।
নয়নের নিরপরাধিতার বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ১ নম্বর রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নূরুল আমিন বলেন, “আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সৈয়দ আমিনুল ইসলাম ওরফে নয়নকে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিং, আলোচনা বা সমাবেশে দেখিনি। ছেলেটি অত্যন্ত নিরীহ, ছোট একটি দোকান চালিয়ে ব্যবসা করত। ব্যক্তি হিসেবে সে খুবই ভালো।”
অনুরূপ বক্তব্য দেন স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. মিজানুর রহমান লিটন। তিনি জানান, “নয়ন অত্যন্ত নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির ছেলে। সে কোনো ধরনের রাজনীতি বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়।” স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ সর্বস্তরের মানুষ একে পুলিশের তথ্যগত ভুল ও পরিকল্পিত চক্রান্ত বলে দাবি করেছেন।
জানা গেছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর বরিশাল বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে ২৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় ২৪ নম্বর আসামি করা হয় আমিনুল ইসলাম নয়নকে। মামলা দায়েরের পরপরই আসামিদের “সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধনী ২০২৫)”-এর ৬(১)(ক)(উ)/৭/৯/১০/১১/১২ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়।
মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১ থেকে ২২ নম্বর আসামি পর্যন্ত সবার নামের পাশে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দলীয় পদ-পদবি স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে। তবে ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর আসামির ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পদের উল্লেখ নেই; কেবল ব্র্যাকেটে লিখে দেওয়া হয়েছে ‘সক্রিয় সদস্য’।
ঘটনার বর্ণনা নিয়ে এজাহারে বলা হয়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ২:১৫ মিনিটে নগরীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইছাকাঠী মার্কাস মসজিদ ও লাদেন সড়কের মধ্যবর্তী শিকদার বাড়ির সামনে থেকে আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এই বিবরণ সম্পূর্ণ অসত্য। নয়নকে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা সড়ক থেকে নয়, বরং ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৮:৩০ মিনিটে তাঁর নিজ বাসা থেকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ এবং পরে এই সাজানো মামলায় যুক্ত করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, নয়নের দাদার এক ওয়ারিশ (যিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে চলাফেরা করেন) রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নয়নকে “নিষিদ্ধ আ.লীগের সক্রিয় সদস্য” হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করিয়েছেন। মূলত, যৌথ পরিবারের জমিজমা ও পারিবারিক সম্পত্তির দ্বন্দ্বে নয়নকে নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেই সে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে চক্রান্তমূলকভাবে নয়নকে ফাঁসিয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার বাদী এসআই ইদ্রিস আলীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফোনে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
একজন নির্দোষ যুবককে চক্রান্তমূলকভাবে “নিষিদ্ধ আ.লীগের সক্রিয় সদস্য” আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে দেওয়ায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ, নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই অসত্য মামলা থেকে নয়নের নাম প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁর মা সৈয়দা মিনারা বেগম (৫০), বোন সৈয়দা ফারজানা আক্তার এবং ভগ্নিপতি মো. ইসতিয়াক আহম্মেদ।