বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৫:৪০ অপরাহ্ন
যশোর মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ না করে কেবল ফসল ও গাছের ক্ষতিপূরণ দিয়ে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের পদক্ষেপ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণ করে কেন কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
গত ৮ মার্চ বিচারপতি রজিক—আল—জলিল এবং বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। সম্প্রতি মামলার সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। যশোর পাওয়ার হাউসে সঞ্চালন লাইনটি প্রবেশের জন্য মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন হরিণার বিলের মধ্য দিয়ে ৩ লাখ ২০ হাজার ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক খুঁটি (পিলার) স্থাপনের কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে যেসব জমির ওপর দিয়ে এই লাইন যাবে, তার মালিকদের কোনো প্রকার অবহিত করা ছাড়াই জোরপূর্বক কাজ শুরু করার অভিযোগ ওঠে।
মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পর বিভিন্ন শ্রেণি—পেশার মানুষ তাদের সঞ্চয় ভেঙে এর আশপাশে জমি কিনেছেন। বর্তমানে এসব জমির প্রতি শতকের মূল্য ৮ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের এই সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হলে লাইনের দুই পাশের শত শত মানুষের মূল্যবান জমিগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এই আশঙ্কায় জমির মালিকরা কাজে বাধা দিলে ঠিকাদারের লোকজন ২০২৪ সালের ২০ মে যশোরের জেলা প্রশাসকের জারি করা একটি গণবিজ্ঞপ্তি (স্মারক নং—৩৮৮) প্রদর্শন করেন। সেখানে জানানো হয়, ‘পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’—এর আওতায় ২৩০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য বিদ্যুৎ আইন ২০১৮—এর ধারা ৬(২) অনুযায়ী কেবল ক্ষতিগ্রস্ত গাছ ও ফসলের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।
এর বিপরীতে ক্ষুব্ধ জমির মালিকদের পক্ষে মো. আমির হোসেন জুয়েলসহ স্থানীয়রা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং ১৩৩৭/২০২৬) দায়ের করেন। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ আইন ২০১৮—এর ১৪ ধারা এবং স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭ অনুযায়ী, স্থায়ী স্থাপনা বা সঞ্চালন লাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। জমি অধিগ্রহণ না করে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেয়া আইনের পরিপন্থী।
আদালতে পিটিশনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী বিভূতি তরফদার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী ও আহসান হাবিবসহ অন্যরা। শুনানি শেষে আদালত ৪ সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সচিব, পিডিবির চেয়ারম্যান, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং যশোরের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ৬ জন প্রতিপক্ষকে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেন।
রিটকারী মো. আমির হোসেন জুয়েল জানান, উচ্চ ভোল্টেজের লাইনের নিচের জমি ও লাইনের দুই পাশে থাকা ৩০ ফুট করে মোট ৬০ ফুট জমি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এবং জমির মূল্য ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন একটি বৈদ্যুতিক মহাসড়ক। এর নিচে ও পাশের জমিতে কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। কোনো কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেবে না। এমনকি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া যাবে না। অথচ বিদ্যুৎ আইনে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা চাই, মহাসড়ক নির্মাণের জন্য যেমন স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনে জমি অধিগ্রহণ করা হয়, ঠিক ওই আইন মেনে বৈদ্যুতিক মহাসড়ক নির্মাণেও জমি অধিগ্রহণ করা হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ না করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে আমরা সাধারণ জমির মালিকরা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হব। আমরা আইনের শাসন এবং ন্যায্য বিচার প্রত্যাশা করছি।’
Leave a Reply