মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৯:৩৭ অপরাহ্ন
রবিউল ইসলাম রবি ॥ আইন অমান্য করে বরিশাল কীর্তনখোলা (ত্রিশ গোডাউন) নদীর ‘ফোরশোর এরিয়া’ বা নদীর তীরবর্তী শহর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে বিম ও পিলারের উপর ছাদ ঢালাই দিয়ে ভবন নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন ঠিকাদার মো. মতিয়ার রহমান। একই পন্থায় নদীর বাঁধ সংলগ্ন জমিতে আরো প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়েছে। গত ৪ মাস পূর্বে কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হলেও সম্প্রতি রহস্যজনকভাবে ঠিকাদার মতি দ্রুততার সাথে ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে যাচ্ছেন। নদীর তীরের বাঁধ ঘেঁষে স্থায়ী ভবন নির্মাণের বৈধ না অবৈধ তা নিয়ে প্রশ্নের দানা বেঁধে উঠেছে জনমনে। জানতে চাইলে দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্মকর্তা ও পরিবেশবাদীদের কাছে পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)—এর বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, নদী তীরবর্তী ও পোর্ট এরিয়ায় জোয়ারের পানির সীমানা থেকে ২০ মিটারের মধ্যে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা আইনত নিষিদ্ধ এবং এমন কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে অবৈধ, বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)—এর বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. রফিকুল আলম বলেন, সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষার জন্য কীর্তনখোলা নদীর ‘ফোরশোর এরিয়া’ ও বাঁধ ঘেঁষা জমিতে থাকা সব স্থাপনা জরুরিভাবে উচ্ছেদ করা দরকার, কারণ আইন অনুযায়ী এসব স্থাপনা সম্পূর্ণ অবৈধ।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আশির দশকে বরিশাল ডিসি অফিস থেকে সরকারি খাস জমি থেকে দুই দাগে ১৪০ শতাংশ জমি নগরীর রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে কার্ডের মাধ্যমে বরাদ্দ নেয়। পরবর্তীতে ক্রয় বিক্রয় সূত্রে উক্ত জমির বর্তমানে রেকর্ডীয় মালিক হলেন নগরীর জর্ডন রোডের বর্তমান বাসিন্দা ঠিকাদার মোঃ মতিয়ার রহমান ওরফে ট্রাঙ্ক মতি। তিনি ২০২৫ সালের আগষ্ট মাসে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেন। নদীর তীরে স্থায়ী স্থাপনার কারণে জনমনে নির্মানাধীন কার্যক্রমের বৈধ অবৈধতা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র বরিশাল নদী বন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, নদীর পাশের জমিটি বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বরাদ্দকৃত কার্ডের জমির ক্রয়সূত্রে বর্তমানে এস.এ. ও বি.এস. পর্চা অনুযায়ী রেকর্ডীয় মালিক মোঃ মতিয়ার রহমান। বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ’র জরিপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জরিপ শেষে যেমন নির্দেশনা আসবে সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে। এই অবস্থায় কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রে (এনওসি) সরাসরি অ্যাকশন নেয়ার সুযোগ নেই। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবশ্যই খোঁজ নেয়া হবে।
বরিশাল সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আজহারুল ইসলাম বলেন, সরকারি দপ্তরের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আইনে কী উল্লেখ রয়েছে তা বলতে পারবো না। তবে ভূমি আইনানুযায়ী জমির এস.এ. ও বি.এস. পর্চায় যার নামে তিনিই জমির মালিক, তবে ডিসি অফিস থেকে বরাদ্দকৃত কার্ডের জমিটি পরবর্তীতে আইন পরিবর্তনের আগেই পূর্বের আইন অনুযায়ী ক্রয়সূত্রে কেউ রেকর্ডীয় মালিক হয়েছিলেন। তবে ভবন নির্মাণাধীন কার্যক্রম বৈধ কিনা তা তিনি জানেন না।
বরিশাল সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ ফরিদা সুলতানা বলেন, জমির তথ্য তুলে ধরে আবেদন করলে সেখানে নির্মাণাধীন ভবনের প্ল্যান রয়েছে কিনা জানানো যাবে। কারণ, আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নেই।
বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এস.এ. শাখায় (পর্যটক ও নদী বন্দর) নদীর পাড়ের বাঁধ ঘেঁষে স্থাপনার নির্মাণাধীন কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে— বিষয়টি সম্পর্কে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)কর্মকর্তার সাথে আলাপ করার পরামর্শ দেন। মুঠোফোনে এডিসি মোঃ ওবায়দুল্লাহ কে — “কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে ত্রিশ গোডাউন এলাকায় নদীর বাঁধ ঘেঁষে ফাউন্ডেশন করে বিম, কলাম ও ছাদ ঢালাই দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ কার্যক্রম চলছে— যা বাংলাদেশ পানি আইন, ইমারত নির্মাণ আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অমান্য হচ্ছে। জোয়ারের পানির সীমানা থেকে ২০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে এই পর্যন্ত শুনতে শুনতেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।”
বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের (বিভাগীয় কার্যালয়) সহকারী পরিচালক মোঃ সোহেল মাহমুদ বলেন, পরিচালক স্যারের সাথে আলোচনা করে সরেজমিন পরিদর্শন করে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি পরিবেশ আইনের আওতার মধ্যে রয়েছে কিনা দেখে তারপর সাক্ষাৎকার দেওয়া যাবে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাবেদ ইকবাল বলেন, বরিশালের বান্দ রোড এক সময় ছিল কীর্তন খোলা নদীর বাঁধ। ৪০/৫০ বছর আগের হিসাব অনুযায়ী বান্দ রোডের পাড় সব সরকারি জমি। আজ সেখানে সরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক মানুষ রেকর্ডীয় সম্পত্তির মালিক হয়েছে। প্রশ্ন আসে, আইন প্রয়োগ করলে সরকার কত সাল ধরে বাস্তবায়ন করবে। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেবেন বলে জানান।
ঘটনাস্থলে ঠিকাদার মোঃ মতিয়ার রহমানের নির্মাণাধীন ভবনের ছবি ও নানা তথ্য সংগ্রহ করার পরই তার ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি বরিশালে নেই। ঠিকাদার মোঃ মতিয়ার রহমানের ছেলে অন্তর—এর মুঠোফোনে জানতে চাইলে বলেন, তার বাবা প্রায় ১ সপ্তাহ পর বরিশাল আসবেন। তার পিতার ভবন নির্মাণের সব কার্যক্রম বৈধ। সব দপ্তরের অনুমতির পাশাপাশি সব বৈধ কাগজপত্র রয়েছে বলে তিনি জানান।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, নদীর পাড় বা “ফোরশোর এলাকা” সরকারি খাস জমি হিসেবে গণ্য হয়। নদীর তীরবর্তী খাস জমি রক্ষা করা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। বাংলাদেশ পানি আইন—২০১৩, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন—২০০০, ইমারত নির্মাণ আইন—১৯৫২, রাষ্ট্রীয় জমি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন—১৯৫০, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন—১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০), এবং ‘নদী রক্ষা কমিশন—এর নির্দেশনা অনুযায়ী ‘ফোরশোর এরিয়া’ ও নদী তীরবর্তী বাঁধ সংলগ্ন সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমূহের অনুমোদন, ছাড়পত্র ও আইনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে কোনো প্রকার স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।
নদী তীরবর্তী জমির মালিক কোনো ব্যক্তি বা সরকার যেই হোক, সেই জমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা বা অবকাঠামো তৈরির পূর্বেই সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্ল্যান অনুমোদনের জন্য বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবার যমুনা অয়েল ডিপো থাকার ফলে ফায়ার লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। সচেতন মহলের দাবি— সৌন্দর্য ও মনোরম পরিবেশ রক্ষার্থে যেখানে বিবির পুকুর পাড়, চৌমাথা লেকের পাড় ও বেলস পার্ক সহ বিভিন্ন স্থানের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, ঠিক তেমনি কীর্তন খোলা নদীর বাঁধ ঘেঁষে নির্মিত হওয়া স্থাপনা অবিলম্বে ভেঙে দেওয়া উচিত।