রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৮:০০ অপরাহ্ন

শিরোনাম
কাজিরহাটে ড্রাইভারের ছদ্মবেশে মাদক কারবার: আতঙ্কে এলাকাবাসী, ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে  অনিয়ম-দূর্ণীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মঠবাড়িয়ায় চেতনানাশক খাইয়ে চুরি: অচেতন—৩ উজিরপুরে আগুন লাগার দেড় ঘণ্টা পর আগুন নিভাতে ফায়ার সার্ভিস, দোকান পুড়ে ভস্মীভূত কাউখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে জনবল সংকট, ব্যাহত সেবা কার্যক্রম শালিস বৈঠকে রক্তক্ষয়ী হামলা: আহত ৪, জেল হাজতে ৩ ৮ কোটি টাকার চুক্তিতে ‘ডিসি’ পদের চুক্তির অভিযোগ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ববি’র উপপরিচালক সেলিনা বেগম সাময়িক বরখাস্ত বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যুবককে হত্যা, গ্রেপ্তার ২ আমির হামজাকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ
৮ কোটি টাকার চুক্তিতে ‘ডিসি’ পদের চুক্তির অভিযোগ

৮ কোটি টাকার চুক্তিতে ‘ডিসি’ পদের চুক্তির অভিযোগ

নগদ আট কোটি টাকার বিনিময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ বাগিয়ে নেওয়ার বিস্ফোরক চুক্তির অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনিক অঙ্গনে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস. এম. সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে এই ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং কোটি টাকার গোপন চুক্তিপত্রের নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলায় নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার চরম বিপর্যয়, সুসংগঠিত চাঁদাবাজি, তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিক নির্যাতন ও অবরুদ্ধ করে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ ঘিরে এখন ক্ষোভ ও বিতর্কের ঝড় বইছে।

অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই কলঙ্কিত হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস. এম. সরওয়ার কামাল, যাকে ঘিরে এখন চসিকের ভেতরে—বাইরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অভিযোগের ভয়াবহতা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর (শো—কজ) নোটিশ জারি করতে বাধ্য হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আট কোটি টাকার বিনিময়ে কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়নের লক্ষ্যে তিনি একটি গোপন অঙ্গীকারনামা ও চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।

গত বুধবার (১৩ মে) স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন—২ শাখা থেকে জারি করা ওই নোটিশে সরওয়ার কামালকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে আট কোটি টাকার বিনিময়ে ডিসি পদ নিশ্চিত করতে একটি চুক্তিপত্র ও সম্মতিপত্র স্বাক্ষরের নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। চসিকের ভেতরে—বাইরে এখন একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ কি তবে এখন প্রকাশ্যে দর—কষাকষির পণ্যে পরিণত হয়েছে?

বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন খোদ চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, “আট কোটি টাকার চুক্তির বিষয়টি আমিও শুনেছি। যেহেতু মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্ত করছে, তাই আমি আর হস্তক্ষেপ করছি না।” তবে তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

চসিকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই সরওয়ার কামাল কার্যত রাজস্ব বিভাগকে নিজের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বলয়ে নিয়ে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে যত বড় অভিযোগই উঠুক না কেন, রহস্যজনক কারণে প্রতিবারই তিনি পার পেয়ে যান। অনেক কর্মকর্তা—কর্মচারীর ভাষ্য, চসিকে যেন তিনিই “অঘোষিত সম্রাট”, যার সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলার সাহস কেউ পায় না।

এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও একটি ভয়াবহ অভিযোগ—পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক হেনস্তা ও অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি মাসের ৭ মে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রতিবেদক ওমর ফারুক চসিকের রাজস্ব বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের বিষয়ে বক্তব্য নিতে চসিক ভবনে যান। প্রথমে তিনি রাজস্ব কর্মকর্তা সাব্বির রহমান সানির সঙ্গে কথা বলেন। পরে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে সরওয়ার কামালের কক্ষে প্রবেশ করতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, কক্ষে প্রবেশের পরই তাকে উদ্দেশ্য করে অপমানজনক, তাচ্ছিল্যপূর্ণ ও হুমকিমূলক ভাষায় কথা বলা হয়। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয় এবং অবৈধভাবে প্রায় ৪৫ মিনিটেরও বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত চ্যাট, এমনকি ব্যক্তিগত ছবি ও গ্যালারিও তল্লাশি করা হয়।

শুধু তাই নয়, মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের নম্বর সংগ্রহ করে ফোন দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সাংবাদিককে “চাঁদাবাজ” আখ্যা দিয়ে পুলিশে সোপর্দ কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

সাংবাদিক ওমর ফারুক বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের ন্যক্কারজনক আচরণ শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে এভাবে অপদস্থ, অবরুদ্ধ ও হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত এবং এটি একটি ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে।

এদিকে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে সরওয়ার কামালের কথিত অঙ্গীকারনামা ও সম্মতিপত্র সামনে আসার পর। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নথিতে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন নিশ্চিত হলে নগদ আট কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। শুধু তাই নয়, দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা এবং মনোনীত রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলার অঙ্গীকারও সেখানে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতির নজিরই হবে না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর ভয়াবহ নৈতিক পতনের বার্তা বহন করবে।

অভিযোগের আরেকটি বিস্ফোরক দিক হলো, চসিকের রাজস্ব বিভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত “অর্থ আদায়ের সিন্ডিকেট”। একাধিক লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরওয়ার কামালের प्रत्यक्ष নিয়ন্ত্রণে টিও, ডিটিও, কর আদায়কারী ও অনুমতি পরিদর্শকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মাস শেষে অনেক কর্মচারী বেতন হাতে পেলেও নানা অজুহাতে সেই অর্থের বড় অংশ কেটে নেওয়া হয়। এমনকি “স্কেল প্রদান”—এর নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে স্থায়ী পদে না থাকা ব্যক্তিদের অবৈধভাবে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতি মাসে একাধিক সভা ও মিটিংয়ের নামে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিটি সভায় আপ্যায়নের অজুহাতে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় এবং মাসে গড়ে ২২টি সভার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির নামে পার্সেল এনে অতিরিক্ত বিল প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের একটি কৌশলী প্রক্রিয়াও পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।

‘পিকনিক’ আয়োজনের নামেও নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে অংশগ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নানা উপায়ে হয়রানি ও চাপ প্রয়োগ করা হয় বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগ আরও বলছে, তথাকথিত “সার্কেল ভিজিট” কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রতিবার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। একইসঙ্গে বড় অঙ্কের হোল্ডিং চেক নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে সেখান থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ, এমনকি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কম্পিউটার, এলইডি টিভিসহ মূল্যবান উপঢৌকন গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে।

শুধু তাই নয়, রাজস্ব বিভাগে ভয় ও আতঙ্কের সংস্কৃতি তৈরি করতে বিভিন্ন সার্কেলে দালাল নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব দালাল কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

তথ্য অনুযায়ী, সরওয়ার কামাল বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা। উপসচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা বর্তমানে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি তিনি প্রেষণে (ডেপুটেশনে) এ পদে যোগ দেন। এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ মাঠ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন এস. এম. সরওয়ার কামাল। তার দাবি, কথিত অঙ্গীকারনামা ও চুক্তিপত্র সম্পূর্ণ ভুয়া এবং সেখানে তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আট কোটি টাকার চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। যে বিভাগ থেকে নোটিশ ইস্যু হয়েছে, আপনারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।” এছাড়াও তিনি দাবি করেন, চসিকের সরওয়ার কামাল নামের কাউকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 Raytahost.Com
Design by RaytaHost