
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আগুনমুখা নদীর মোহনায় অবস্থিত ‘মিনি কুয়াকাটা’ খ্যাত পানপট্টি লঞ্চঘাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও বেড়িবাঁধ দখল করে দোকানপাট নির্মাণ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে এলাকার পরিবেশ ও পর্যটন সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনই বেড়িবাঁধের ওপর নির্মিত কংক্রিট ব্লকের জায়গা দখল করে নতুন নতুন দোকান বসানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও দোকান নির্মাণের জন্য বেড়িবাঁধের সুরক্ষা ব্লকও সরিয়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে নদীতীরের নান্দনিক পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পানপট্টি লঞ্চঘাট এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীতীর রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এলাকার দৃশ্যপট বদলে যায়। আগুনমুখা নদীর বিশাল জলরাশি, শীতল বাতাস, ঢেউ এবং মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত পর্যটক সেখানে ভিড় করেন। বিশেষ করে শুক্রবার পুরো এলাকাই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, নদীভাঙন রোধ ও তীর সংরক্ষণের লক্ষ্যে ৫৫/১ পোল্ডারের ৪১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় পানপট্টি লঞ্চঘাট এলাকায় ৫০০ মিটারজুড়ে কংক্রিট ব্লক স্থাপন করা হয়। এরপর থেকেই এলাকাটি স্থানীয় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যটকদের কেন্দ্র করে নদীতীরে চা-কফি, ফুচকা, চটপটি, ফাস্টফুডসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। এতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও পরিকল্পনাহীনভাবে দোকান স্থাপন, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে এলাকার সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত ওয়াশরুম, বসার স্থান, সড়কবাতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবও রয়েছে।
পর্যটকদের অভিযোগ, বেড়িবাঁধের জায়গা দখল করে স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতামূলকভাবে দোকান নির্মাণ করছেন। ফলে নদীর পাড়ের উন্মুক্ত পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি মাঝে মধ্যে মারামারি, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
পর্যটক নাজমা ইসলাম সিমলা বলেন, “পানপট্টি লঞ্চঘাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি একটি আদর্শ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।”
আরেক পর্যটক মো. আজাদ বলেন, “যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো দোকানপাট গড়ে উঠছে, তাতে মনে হচ্ছে কে কার আগে জায়গা দখল করবে সেই প্রতিযোগিতা চলছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জায়গাটিকে পর্যটকদের জন্য উপযোগী করা।”
স্থানীয়দের মতে, বসার বেঞ্চ, আধুনিক ওয়াশরুম, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে পানপট্টি লঞ্চঘাট দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা সেই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, “পানপট্টি লঞ্চঘাট এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রশাসন কাজ করছে। বেড়িবাঁধ বা সরকারি জায়গা দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। অবৈধ স্থাপনা থাকলে তা নিয়ম অনুযায়ী অপসারণ করা হবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব জানান, অবৈধ স্থাপনার মালিকদের ইতোমধ্যে তিন দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা অপসারণ না করলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।