বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ন
দক্ষিণাঞ্চলের রেনুপোনা পাচারকারি
প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য জড়িত থাকার দাবি
দক্ষিণাঞ্চলে গলদা চিংড়ির রেনুপোনা অবৈধ পাচার দীর্ঘদিন ধরে চলমান বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই বাণিজ্যের পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য জড়িত থাকার অভিযোগ করা হচ্ছে।
গোপালগঞ্জের টুলু নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এই রেনুপোনা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের শেখ হেলালের প্রভাব ব্যবহার করে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে স্থানীয়দের দাবি। ৫ আগস্টের পর একাধিক রাজনৈতিক মামলায় তিনি আসামি হন এবং কারাভোগও করেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, বরিশাল নগরীর হোটেল গ্রান্ড পার্ক ও হোটেল রোদেলায় একাধিক দফা বৈঠক করে গলাচিপা থেকে গৌরনদী রুটে চলাচলকারী রেনুপোনা পরিবহন নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি অর্থনৈতিক সমঝোতা হয়। ওই বৈঠকে প্রশাসন, সাংবাদিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের জন্য প্রায় ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দের আলোচনা হয় বলে সূত্রে পাওয়া গেছে। পরে তা ৪৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয় বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে, যাতে পরিবহন চলাচলে বাধা না আসে।
বরিশাল বিভাগের রেনুপোনা পাচার সিন্ডিকেটে টুলু ছাড়াও সিপন, হারুন, বিপ্লব, রনি, জিন্নাত ডাক্তার, নিও, সুমনরাজ, ছকেট জামাল, প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
বরিশাল নগরীর শিকারপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় পিবিআই সদস্য পরিচয়ে চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রেনুপোনা পরিবহন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে প্রতিবেদক দল। অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল পিবিআই’র কনস্টেবল মেহেদি হাসান নিজেকে এসআই পরিচয় দিয়ে গলদা চিংড়ির রেনুপোনা ভর্তি একটি ট্রাক ও সিএনজি আটক করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে সমঝোতায় ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয় এবং তা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
ঘটনাটি ভোর ৪টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল বলে জানা যায়। এই সময়ে আটক অবস্থায় প্রায় ৯০ হাজার অবৈধ রেনুপোনা মারা যায়, যার আর্থিক ক্ষতি আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকার বেশি বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন।
পরবর্তীতে অনুসন্ধানী দল চাদপাশা–সায়েস্তাবাদ সংযোগ নোমরহাট ব্রিজ এলাকায় অবস্থান করে। সেখানে স্পিডবোট, ট্রলার ও রেনুপোনা পরিবহনের দৃশ্য ধারণ করা হয়।
ঘটনাস্থলে পিবিআই কনস্টেবল মেহেদি হাসান এবং আরিফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন, উপস্থিত ছিলেন বলে দেখা যায়। তাদের তত্ত্বাবধানে রেনুপোনা ভর্তি ড্রাম ট্রাকে তোলা হচ্ছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন- মৎস্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট থানাকে কেন জানানো হয়নি? আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেন সরাসরি আটক ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা হলো?
এটি কি নিয়মিত অভিযান, নাকি ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র বলছে, পুরো ঘটনার পেছনে রয়েছে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্ব।
ভোলার জিন্নাত ডাক্তার, যিনি একই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং কনস্টেবল মেহেদি হাসানের আত্মীয় বলে দাবি করা হচ্ছে, তার প্রভাবেই এই ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে- প্রতিযোগিতা দমাতে কি কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে?
অভিযোগের বিষয়ে কনস্টেবল মেহেদি হাসান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
তবে অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন বা যাচাইসাপেক্ষ, এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
Leave a Reply