শনিবার, ১৮ Jul ২০২৬, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন
বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। স্থানীয় সময় রোববার (২০ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বাঁশি বাজাবেন ৪৬ বছর বয়সী এই রেফারি।
তবে দায়িত্ব ঘোষণার পর থেকেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি পুরোনো স্মৃতি—ভিনচিচের অধীনেই ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে হেরেছিল লিওনেল মেসির দল। তবে সেই ম্যাচে এই রেফারির সিদ্ধান্তে পাওয়া পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোল করেছিলেন মেসি।
ফিফা বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাতে ফাইনালের ম্যাচ কর্মকর্তাদের নাম ঘোষণা করে। ভিনচিচের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তারই স্বদেশি তোমাজ ক্লানচনিক ও আন্দ্রাজ কোভাচিচ। চতুর্থ রেফারি থাকবেন জর্ডানের আধহাম মাখাদমেহ এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কাতারের মোহাম্মদ আলকালাফ।
এটাই হবে ভিনচিচের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল। দায়িত্ব পাওয়ার খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই স্লোভেনিয়ান রেফারি। ২০১০ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির স্বীকৃতি পাওয়ার পর ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি। ২০২৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও তার হাতেই ছিল বাঁশি।
বিশ্বকাপে ভিনচিচের অভিষেক হয় ২০২২ সালের কাতার আসরে। সেখানে দুটি ম্যাচ পরিচালনার পর ২০২৬ বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ব্রাজিল—মরক্কো, জর্ডান—আলজেরিয়া এবং মেক্সিকো—ইকুয়েডর ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর্জেন্টিনা—স্পেন ফাইনাল হবে তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচ।
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে ভিনচিচের নাম উচ্চারিত হলেই ফিরে আসে কাতার বিশ্বকাপের সেই সৌদি আরব ম্যাচের স্মৃতি। গ্রুপ পর্বের ওই ম্যাচে তার সিদ্ধান্তে সপ্তম মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে গোল করেছিলেন লিওনেল মেসি। তবে এরপর লাউতারো মার্তিনেজের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ২—১ ব্যবধানে জিতে নেয় সৌদি আরব। ওই হারেই ৩৬ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার।
ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনার কোনো ফুটবলার হলুদ কার্ড না দেখলেও সৌদি আরবের ছয়জন ফুটবলার পেয়েছিলেন। তবু অনেক আর্জেন্টিনা সমর্থকের কাছে ভিনচিচ সেই ম্যাচের তিক্ত স্মৃতির অংশ হয়ে আছেন।
অন্যদিকে স্পেনের ম্যাচ পরিচালনায় ভিনচিচের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ। ২০১৭ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ দিয়ে শুরু করে তিনি ২০২০ ইউরোয় স্পেন—সুইডেন ম্যাচ, ২০২৩ উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেন—ইতালি এবং ২০২৪ ইউরোতে ইতালি ও ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই সেমিফাইনালেই দুর্দান্ত গোলে আলোচনায় আসেন তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল।
তবে ভিনচিচের ক্যারিয়ারে বিতর্কও কম নেই। ২০২০ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় একটি পুলিশ অভিযানের সময় মাদক, অস্ত্র ও পতিতাবৃত্তি সংশ্লিষ্ট তদন্তে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। অভিযানে বিপুল পরিমাণ কোকেন, আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। যদিও শুরু থেকেই নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন ভিনচিচ। তার দাবি ছিল, তিনি কেবল পরিচিত এক ব্যক্তির আমন্ত্রণে দুপুরের খাবারে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন এবং ঘটনাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
পরবর্তীতে স্লোভেনিয়া ফুটবল ফেডারেশনও তার পাশে দাঁড়ায়। ফেডারেশনের দাবি, ভিনচিচ ‘ভুল সময়ে ভুল জায়গায়’ উপস্থিত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে তিনি নিয়মিতভাবেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করে আসছেন।
এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার কাঁধেই থাকছে দায়িত্ব। একদিকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে শিরোপা জয়ের অপেক্ষায় স্পেন। এমন এক ফাইনালে ভিনচিচের প্রতিটি সিদ্ধান্তই থাকবে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর তীক্ষ্ণ নজরে। আর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আশা, ২০২২ সালের সেই তিক্ত স্মৃতি এবার বদলে যাবে নতুন এক সোনালি ইতিহাসে।