
ঝালকাঠি জেলায় দীর্ঘদিন ধরে ১২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। এর পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৮৭টি সহকারী শিক্ষকের পদও খালি থাকায় সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষক সংকট। ফলে একদিকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে যেসব বিদ্যালয়ে একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি সংকটপূর্ণ। প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাসও নিতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ সামলে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষক—কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষককে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় অনেক সময় পাঠদানে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের নেতৃত্বের ঘাটতিও দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার ৯১ নম্বর দেরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তাকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং প্রশাসনিক কাজও করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে তাকে নিয়ে মাত্র চারজন শিক্ষক রয়েছেন। ফলে বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম সামলাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।”
কাঁঠালিয়া উপজেলার ৪৪ নম্বর কাঁঠালিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান জানান, “প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তিনি সহকারী শিক্ষকের বেতন—ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ—সুবিধাই পাচ্ছেন। বিদ্যালয়ে ৩০১ জন শিক্ষার্থী থাকায় প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি অন্যান্য কাজ পরিচালনা করতে তাকে বেশ চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর ঝালকাঠি জেলার সাধারণ সম্পাদক ও টিআইবির সনাক সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, “জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন শিক্ষক পদ শূন্য থাকা স্বাভাবিক পাঠদানকে বাধাগ্রস্ত করছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষকও প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।”
ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহিনুল ইসলাম মজুমদার বলেন, “প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হলে সংকটের সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।”
প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। সেই স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ খালি থাকায় শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্ব এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা জরুরি।
ঝালকাঠির ১২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ এবং সহকারী শিক্ষকের ২৮৭টি শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের শিক্ষা তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শূন্য পদগুলো পূরণ করে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কাঠামো কার্যকর করার দাবিও উঠেছে।