রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন
বরগুনার পাথরঘাটা থানার বিতর্কিত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ এনামকে প্রশাসনিক কারণে ক্লোজ করে বরগুনা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এক নারী বাদীর সঙ্গে অশালীন ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর এ পদক্ষেপ নেয় পুলিশ প্রশাসন।
বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পাথরঘাটা থানার ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পাথরঘাটা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহেদ চৌধুরীকে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “পাথরঘাটা থানার ওসির অপকর্মের দায় বাংলাদেশ পুলিশ নেবে না। তিনি যদি কোনো অপকর্ম করে থাকেন, তার দায়ভার তাকেই নিতে হবে এবং শাস্তিও পেতে হবে।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে যারা সত্য ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞ।
যে ঘটনায় ওসি ক্লোজ সম্প্রতি বরগুনার পাথরঘাটায় আদালতের নির্দেশে দায়ের হওয়া একটি মামলার নারী বাদী ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে মামলার প্রধান আসামি বাদশা আকনের বিরুদ্ধে। এর আগে মামলা গ্রহণে বিলম্ব এবং বাদীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে পাথরঘাটা থানার ওসি মোহাম্মদ এনামের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার চরদুয়ানী এলাকা থেকে পাথরঘাটা থানায় আসার পথে অর্পার পথরোধ করে তাকে মারধর করা হয় এবং একটি ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পাথরঘাটা সার্কেল) মোহাম্মদ শাহেদ চৌধুরী বলেন, হামলার খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ পাঠানো হয় এবং বাদীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ, তবুও মামলা নিতে বিলম্বের অভিযোগ
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ মে বরগুনার এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. সাইফুর রহমান ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পার দায়ের করা অভিযোগকে এফআইআর হিসেবে গণ্য করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পাথরঘাটা থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
তবে বাদীর অভিযোগ, আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মামলা নিতে বিলম্ব করা হয়। এমনকি আদালতের আদেশ নিয়ে থানায় গেলে সহযোগিতার পরিবর্তে তাকে অপমানজনক আচরণের মুখে পড়তে হয়।
অর্পার ভাষ্য অনুযায়ী, ওসি মোহাম্মদ এনাম তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি সেই মাল? ইবলিস যেন কোথাকার।” এতে তিনি অপমানিত ও বিব্রত বোধ করেন। ওই সময় সাবেক পাথরঘাটা উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির নেত্রী মরিয়ম চৌধুরী জেবুও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান বাদী।
মরিয়ম চৌধুরী জেবু বলেন, “আমার উপস্থিতিতে ওসি মামলার বাদী অর্পাকে উদ্দেশ করে ‘আপনি সেই মাল?’ বলে মন্তব্য করেন। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মুখে এমন কথা শুনে উপস্থিত সবাই বিব্রত হয়েছিল। আদালতের নির্দেশনা যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো পরবর্তী ঘটনা এড়ানো যেত।”
ফোনেও সাড়া না দেওয়ার অভিযোগ অর্পা আরও অভিযোগ করেন, গত ১৪ জুন মামলার বিষয়ে কথা বলতে ওসির সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগ করলে মামলার বিষয়ে কথা না বলে কেন ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করা হয়েছে, তা নিয়ে তাকে জবাবদিহি করতে বলা হয়। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ডও তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ডিআইজির পদক্ষেপে প্রশংসা
ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের দ্রুত পদক্ষেপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন মহল তার এ উদ্যোগকে প্রশংসা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরিশাল রেঞ্জে যোগদানের পর থেকেই ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পুলিশি সেবা পৌঁছে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন। তার তৎপরতায় রেঞ্জ পুলিশের মধ্যে শৃঙ্খলা, সততা ও জনসেবামুখী মনোভাব জোরদার হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।