বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ন
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো অবকাঠামো বিক্রি করে দিয়েছে একটি চক্র। গত ২৫ এপ্রিল চাঁনপুর ইউনিয়নের খন্তাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। এদিন নিলামের ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষককে চাপ দেওয়া হয়। পরদিনই পাঁচটি শ্রেণিকক্ষের একটি বড় ঘর ও ওয়াশ ব্লক শ্রমিকদের মাধ্যমে খুলে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন ও পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য গাজী রাসেল। তারা দুজনই বরিশাল উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি সালাউদ্দিন পিপলু জমাদ্দারের অনুসারী।
খন্তাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মারুফ হোসেন বলেন, তাদের বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। এ জন্য আনুমানিক পৌনে এক কিলোমিটার দূরে জমি কিনে সম্প্রতি বিদ্যালয় স্থানান্তর করা হয়। আগের জায়গায় দুটি টিনশেড ঘর ও একটি ওয়াশ ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে ছোট ঘরটি স্থানান্তর করেছে। পাঁচটি শ্রেণিকক্ষের বড় ঘরটি ও ওয়াশ ব্লক আগের জমিতেই ছিল।
মারুফ হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, গত ২৫ এপ্রিল গাজী রাসেল নিলামে কেনার একটি কাগজ নিয়ে বিদ্যালয়ে যান। এতে দেখা যায়, মাহবুবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি টিনশেড ঘর ও ওয়াশ ব্লক নিলামে কিনেছেন। ওই কাগজে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাইনুল হোসেনের সিলসহ সই ছিল। এ জন্য তিনি নিলামপত্রটি সঠিক মনে করেন। গাজী রাসেল তাদের জানান, স্থাপনাগুলো তিনি নিলামে কেনা মাহবুবের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। পরদিন রাসেল শ্রমিক নিয়ে সব স্থাপনা খুলে নিয়ে যান।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাহবুবুর রহমান নামের অজ্ঞাত ব্যক্তির ভুয়া নামে নিলামটি দেখানো হয়। সব স্থাপনা চার লাখ টাকায় কিনে গাজী রাসেল আরও বেশি দামে বিক্রি করেন। প্রধান শিক্ষক মারুফ হোসেন ঘটনার দিনই বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানান। তিনি নিশ্চিত হন নিলামের কাগজটি ভুয়া। স্থানীয় ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গাজী রাসেলের ভয়ে স্থাপনা খুলে নিতে বাধা দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজী রাসেল প্রতিবেদককে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘আপনি এসব কোথায় জেনেছেন? আমি খোঁজ নিচ্ছি।’ এ সময় তিনি নিজেকে একটি আঞ্চলিক দৈনিকের সাংবাদিক হিসেবেও পরিচয় দেন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মাইনুল হোসেন বলেন, ‘আমার স্বাক্ষর স্ক্যান করে জাল নিলামপত্র তৈরি করা হয়েছে। এটি জানতে পেরে তাৎক্ষণিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাই। প্রধান শিক্ষককে থানায় জিডি করতে বলি। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ভয়ে জিডি করেননি। এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে শিক্ষক নেতা চাঁনপুর ইউনিয়নের কানাইগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহবুব হোসেনকে শোকজ করেছি। তিনি ৩০ এপ্রিল শোকজের উত্তর দিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে সুপারিশ পাঠাব।’
মাহবুবুর রহমানকে সন্দেহের কারণ প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মাহবুব এর আগেও কয়েকবার আমার কাছে গিয়ে বিদ্যালয় কেনার কথা বলেছেন। (তিনি) রাজনৈতিক চাপও সৃষ্টি করেছেন।’
সব অভিযোগ অস্বীকার করেন শিক্ষক নেতা মাহবুব হোসেন। তিনি দাবি করেন, শিক্ষা কর্মকর্তা অনেক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি এর প্রতিবাদ করেন। এ জন্য তাঁকে নিলামের ঘটনায় জড়িয়ে শোকজ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুবদল নেতা সালাউদ্দিন পিপলু জমাদ্দারের মোবাইল ফোনে গতকাল বুধবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। তাঁর বড় ভাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গিয়াস উদ্দিন দিপেন জমাদ্দার বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুব বিএনপির একজন সমর্থক। গাজী রাসেল দলের সক্রিয় কর্মী। স্বেচ্ছাসেবক দলে তিনি কী পদে আছেন, তা জানেন না। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বিক্রির অভিযোগের বিষয়েও
জানা নেই তাঁর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিয়াজ উর রহমান গত মঙ্গলবার রাতে সমকালকে বলেন, পুরো বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে বুধবার জানাবেন। গতকাল বুধবার কয়েক দফায় মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
Leave a Reply