মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে নতুন স্থাপিত পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) একটি যৌথ ক্যাম্পে গভীর রাতে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র সন্ত্রাসী এই হামলায় অংশ নেয় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গতকাল রোববার (২৪ মে) দিবাগত রাত ১টার পর জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় স্থাপিত ক্যাম্পে এই হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের দেয়াল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে যৌথ বাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় গুলিবিনিময়ের পর আজ সোমবার ভোরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ও র্যাব সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দিবাগত রাত ১টার পর আকস্মিকভাবে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে অবস্থিত যৌথ ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে সন্ত্রাসীরা। হামলাকারীরা সুপরিকল্পিতভাবে যাতায়াতের বিভিন্ন সড়ক কেটে ফেলে এবং ক্যাম্পের পেছনের অংশের দেয়াল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এ সময় বেশ কিছু অস্থায়ী স্থাপনাও ভাঙচুর করা হয়।
র্যাব—৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘সন্ত্রাসী “ইয়াসিন গ্রুপ” রাতের অন্ধকারে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে এবং ক্যাম্পের সুরক্ষায় আমরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নন—লিথাল (অপ্রাণঘাতী) অস্ত্রের পাশাপাশি পাল্টা গুলি চালানো হয়।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ভোর ৪টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় গুলিবিনিময় চলে। একপর্যায়ে প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
হামলার খবর পেয়ে আজ ভোরেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান পুলিশের ডিআইজি, র্যাব—৭ অধিনায়ক এবং জেলা পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখে আজ সকাল থেকে চিরুনি অভিযান শুরু করেছেন। সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজন বাসিন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আকস্মিক এই হামলার ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এর আগেও সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে এক অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র্যাব—৭—এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে, গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের অংশগ্রহণে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। দীর্ঘ চেষ্টার পর প্রশাসন পুরো এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সেখানে অপরাধীদের পুনর্বাসন ঠেকাতে ছিন্নমূল ও আলীনগর এলাকায় দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
গত ৯ মার্চের অভিযানের পর সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা গা ঢাকা দিলেও বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন, মশিউর রহমান ও নুরুল হক ভান্ডারিসহ শীর্ষ অপরাধীরা অধরাই থেকে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, মূলত এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল এবং ক্যাম্পে নিয়োজিত সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতেই এই সংঘবদ্ধ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।