শুক্রবার, ১৯ Jun ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন
বরিশাল জেলার কাজিরহাট থানার প্রতিটি ইউনিয়নে দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে মাদকের ব্যবসা। লতা, বিদ্যানন্দপুর, আন্দারমানিক, ভাসানচর ও জয়নগর—প্রতিটি এলাকাই এখন মাদকের ‘আঁতুড়ঘরে’ পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় চিহ্নিত মাদক কারবারিরা বীরদর্পে ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ধ্বংসের মুখে পড়ছে স্থানীয় যুবসমাজ, অন্যদিকে এলাকায় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে চুরির ঘটনা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে মাদক কেনাবেচা চলছে লতা ইউনিয়নের একতা কলেজ মাঠ, সোনাপুর গ্রামে বালুর মাঠে। হুয়ারহাট বাজার সংলগ্ন এলাকা এবং রতনপুর এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা ‘সেন্ট টিকিট’ বা বিশেষ টোকেন পদ্ধতির মাধ্যমে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করছে। বিদ্যানন্দপুর ইউনিয়নের শোন খালা বাজারে ইউপি পরিষদের মাঠে রাত ৮টার পর মাদক কারবারিদের মেলা বসে। এছাড়া ৯নং ওয়ার্ডের ইটের ভাটা সংলগ্ন এলাকা এবং পশ্চিম রতনপুর গ্রামের ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডে প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে ব্যবসা চলছে। ৩নং ওয়ার্ডের বাদল রতনপুর গ্রামের জোড়া ব্রিজের কাছে সন্ধ্যার পর বসে মাদকের প্রকাশ্য হাট। জয়নগর ইউনিয়নের জয়নগর ইউনিয়নেও মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কাজিরহাট বাজার সংলগ্ন শিকারি বাড়ির সামনে রাব্বি মেম্বারের বাগানে অতি সন্ধ্যায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকসেবী ও কারবারিরা এসে জড়ো হয়।ভাসানচর ও আন্দারমানিক ইউনিয়ন সহ এসব ইউনিয়নেও চিহ্নিত মাদক সম্রাটরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজিরহাট থানা পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কেবল দু—একজন ‘চুনোপুঁটি’ বা খুচরা মাদকসেবীকে আটক করলেও নেপথ্যে থাকাণ ‘রুই—কাতলারা’ সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। বর্তমানে পুলিশের মাদকবিরোধী দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে।
জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পুলিশের তথ্য ফাঁস এবং থানার ভেতরে অপরাধীদের অবাধ যাতায়াত নিয়ে, অভিযানের তথ্য ফাঁস স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশ মাদক আস্তানায় অভিযানে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তেই থানা থেকে মাদক কারবারিদের কাছে খবর পৌঁছে যায় যে, “পুলিশ আসতেছে!” ফলে অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যায়। থানা থেকে কীভাবে অভিযানের গোপন তথ্য বাইরে পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ চরম ক্ষুব্ধ।থানায় আসামির দাপট সম্প্রতি লতা ইউনিয়নের রতন খাঁর ছেলে ও একাধিক মাদক মামলার আসামি রোমান খাঁ বীরদর্পে কাজিরহাট থানায় প্রবেশ করে। এক সপ্তাহ আগে সে থানায় ঢোকার পর থেকেই পুরো এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী কীভাবে পুলিশের চোখের সামনে থানায় ঘুরে বেড়ায়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন। আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা কিছুদিন আগে এসআই মামুন একটি মাদক আস্তানায় তল্লাশি চালালে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক মাদক কারবারি মালপত্রসহ দৌড়ে পালিয়ে যায়, যাকে আজ পর্যন্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
অভিযোগ রয়েছে, ভাসানচরসহ বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আগামী নির্বাচনের সমীকরণ ও নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে এসব মাদক কারবারিদের দেখেও না দেখার ভান করছেন। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে এবং যুবসমাজকে বাঁচাতে অনতিবিলম্বে যেন প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মাদক ব্যবসা বৃদ্ধি এবং পুলিশের ঝিমিয়ে পড়া অভিযানের বিষয়ে কথা হয় কাজিরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সিদ্দিকুর রহমান—এর সাথে। তিনি সমস্ত অভিযোগের বিপরীতে জানান, আমাদের মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত ও অব্যাহত আছে। মাদকের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে ওসির এই আশ্বাসের পরেও বাস্তবে কাজিরহাটের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদকের যে জাল বিস্তার লাভ করেছে, তা থেকে মুক্তি পেতে ঊর্ধ্বতন মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।,