শুক্রবার, ০৩ Jul ২০২৬, ১২:২৮ পূর্বাহ্ন
বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিং, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মহিপুর উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলেরা। এ পরিস্থিতিতে অবিলম্বে ধ্বংসাত্মক ট্রলিং কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় মহিপুর প্রেসক্লাবের হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলে মো. বেলাল মাঝি। তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে বটম ট্রলিংয়ের কারণে সমুদ্রের তলদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। একই সঙ্গে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে নির্বিচারে মাছ আহরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বেহুন্দি জালসহ ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের কারণে বিপুল পরিমাণ পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ মৎস্য উৎপাদনের জন্য বড় ধরনের হুমকি। অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো প্রায়ই সাধারণ জেলেদের জাল কেটে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলেও অনেক সময় তারা কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পান না বলেও দাবি করেন তিনি। এছাড়া প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ ট্রলিংকারীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে নীরব থাকার অভিযোগও তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১—২২ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে ৭ লাখ ৬ হাজার টন মাছ আহরণ হলেও ২০২৩—২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৮ হাজার টনে। এছাড়া, ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশনের (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুত প্রায় ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দেশের প্রধান মৎস্যসম্পদ ইলিশের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ সময় বক্তব্য রাখেন জেলে নেতা হানিফ মাঝি। তিনি বলেন, একসময় অল্প সময় সমুদ্রে গেলেই পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যেত। এখন দিনের পর দিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলছে না। অবৈধ ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় সাধারণ জেলেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মহিপুর—আলীপুরসহ উপকূলীয় মৎস্য বন্দরগুলোতে আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করেও জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ পাচ্ছেন না। ফলে হাজারো জেলে পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। অনেক পরিবার বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে মামলা ও সম্পদ জব্দের হুমকির মুখে রয়েছে। অনেকে জীবিকার তাগিদে মাছ ধরা পেশা ছেড়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছেন। অর্থাভাবে বহু পরিবার খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা সংকটে ভুগছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
জেলেরা অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী কিছু ট্রলার মালিক ও অসাধু চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইন অমান্য করে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা বিপুল অর্থের মালিক হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ জেলেরা এবং ধ্বংস হচ্ছে দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ।
সংবাদ সম্মেলন থেকে অবৈধ ট্রলিং বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গভীর সমুদ্রে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, নিষিদ্ধ জাল জব্দ, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
জেলেদের মতে, দেশের প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশ সামুদ্রিক মাছ থেকে আসে। তাই মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা না গেলে শুধু জেলেদের জীবন—জীবিকাই নয়, দেশের সুনীল অর্থনীতিও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
অন্যথায় প্রশাসনের ভূমিকার প্রতিবাদে মহিপুর উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণারও ইঙ্গিত দেন।