নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম আজ রাতে পুরো বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের স্বপ্নের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। একদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। দক্ষিণ আমেরিকা আর ইউরোপের রাজা মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বকাপ ফাইনালে। এমনটা অবশ্য আগে কখনো হয়নি। এটা লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। অন্যদিকে লামিনে ইয়ামালের নেতৃত্বে স্পেনের নতুন প্রজন্ম। দুই প্রজন্মের এই সংঘর্ষ ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় লিখতে চলেছে।
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে প্রথম ফাইনাল খেলে ১৯৩০ সালেই, কিন্তু উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়। প্রথম শিরোপা আসে ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাঠে, ড্যানিয়েল পাসারেলার নেতৃত্বে। তবে সেই জয়ের সঙ্গে সামরিক শাসনের বিতর্কও জড়িয়ে আছে। ১৯৮৬ সালে দিয়াগো ম্যারাডোনার জাদুতে দ্বিতীয় শিরোপা। মেক্সিকোয় ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় একক গোল এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে ফাইনালে উঠেও জার্মানির কাছে হার। অনেকে ভেবেছিলেন মেসির ভাগ্যে হয়তো বিশ্বকাপ নেই।
কিন্তু ২০২২ কাতারে মেসি, আলভারেজ আর মার্তিনেজের বীরত্বে তৃতীয় শিরোপা ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তেরা। এবার জিতলে আর্জেন্টিনা হবে টানা চারটি বড় টুর্নামেন্ট জেতা প্রথম দল। কোপা আমেরিকা ২০২১ ও ২০২৪—এর পর এই বিশ্বকাপ অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। এবারের টুর্নামেন্টে তাদের পথ ছিল কঠিন। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে পিছিয়ে বা সমতায় থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা। এদিকে স্পেনের ইতিহাস একদম আলাদা। বছরের পর বছর ‘প্রতিভাবান কিন্তু চাপে পড়লে ভেঙে পড়ে’ বলে সমালোচিত হতো তারা। বড় টুর্নামেন্টে ফেভারিট হয়েও নকআউটে হোঁচট খেত।
২০০৮ ইউরোতে প্রথম বড় শিরোপা। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় জাভি—ইনিয়েস্তার তিকিতাকা ফুটবলে প্রথম বিশ্বকাপ জয়। ফাইনালে ইনিয়েস্তার শেষ মুহূর্তের গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারায় তারা। ২০১২ ইউরো জিতে টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্ট জয়ের রেকর্ডও গড়ে। এরপর আবার পতন। ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়। কয়েক বছর ধরে কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি যেতে পারেনি। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরে নতুন করে জেগে ওঠে স্পেন। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামসদের তরুণ দল ২০২৪ ইউরো জিতে আবার আলো ছড়ায়। এবারের বিশ্বকাপে একবারও পিছিয়ে না পড়ে ফাইনালে উঠেছে তারা। প্রতিপক্ষকে গোলের সুযোগ দেওয়ার হারও রেকর্ড কম।
আর্জেন্টিনায় ম্যারাডোনা, মারিও কেম্পেস, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা আর এখন লিওনেল মেসি। স্পেনে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি, ইকার কাসিয়াস, ফের্নান্দো তোরেস প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলের ইতিহাসে অমর।
অতীত দ্বৈরথ: সমানে—সমান লড়াইয়ের ইতিহাস
আর্জেন্টিনা আর স্পেনের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও কম রোমাঞ্চকর নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত দুই দল মোট ১৪ বার মাঠে নেমেছে। ফলাফল একেবারে সমান, উভয় দলই জিতেছে ৬টি করে ম্যাচ, আর ২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপে মাত্র একবার দেখা। বিশ্বকাপের মঞ্চে অবশ্য দুই দলের সাক্ষাৎ খুবই কম। মাত্র একবার, ১৯৬৬ সালে। সেই ম্যাচে লুইস আর্তিমের জোড়া গোলে আর্জেন্টিনা ২—১ ব্যবধানে স্পেনকে হারিয়েছিল। স্পেনের একমাত্র গোলটি করেন পির্রি।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দলের দেখা হলেই নাটকের অভাব হয় না। ২০১০ সালে আর্জেন্টিনা স্পেনকে ৪—১ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের এক প্রীতি ম্যাচে স্পেন প্রতিশোধ নেয় ভয়ঙ্করভাবে ৬—১ গোলে আর্জেন্টিনাকে উড়িয়ে দেয়। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফে ছিলেন বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি। এবারের ফাইনালে তাই শুধু শিরোপার লড়াই নয়, অতীতের হার—জিতের হিসেবও চুকিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে দুই দলের সামনে। কোন দল এগিয়ে নেবে নিজেদের ঐতিহ্য? উত্তেজনা চরমে!