
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) বিভিন্ন ভবন ও বিনোদনকেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসব স্থাপনায় দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়রা। অথচ বিসিসির ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনাবাসিক ভবন ও বিনোদনকেন্দ্রের সংস্কার বাবদ তিন কোটি ৭০ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৭ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে।
বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে থোক ও বিশেষ বরাদ্দ থেকে এক কোটি ৮৪ লাখ ৭০ হাজার ৩৮৩ টাকা এবং নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এক কোটি ৮৬ লাখ সাত হাজার ৭৬৪ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই সময়ে বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। ফলে বাজেটে দেখানো ব্যয় ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটেও অনাবাসিক ভবন ও বিনোদনকেন্দ্র সংস্কারে সাত কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার ২৮০ টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ ও থোক বরাদ্দ থেকে পাঁচ কোটি ৯০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৭১ টাকা এবং নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এক কোটি ৩৮ লাখ ৮১ হাজার ৮০১ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একই ধরনের স্থাপনা সংস্কারে ২০ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিপুল এই অর্থ বরাদ্দ ও আগের অর্থবছরগুলোর ব্যয়ের হিসাব নিয়ে নগরবাসী এবং বিসিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিসিসির তত্ত্বাবধানে থাকা বিনোদনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে আমানতগঞ্জ শিশু পার্ক, বেলস পার্ক, গ্রিন পিটি পার্ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঞ্চন পার্ক, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, স্বাধীনতা পার্ক, কীর্তনখোলা নদীসংলগ্ন ৩০ গোডাউন বধ্যভূমি, শহীদ গুরুর-গফুর পার্ক এবং বিবিরপুকুর পাড়ের পাবলিক স্কয়ার।
সম্প্রতি সরেজমিনে কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় এসব পার্কে তেমন কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক বাতিও ছিল না। বর্তমান প্রশাসকের সময়ে কয়েকটি স্থানে বাতি স্থাপনসহ সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে।
বিসিসির অনাবাসিক ভবনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বরিশাল নগর ভবন ও এনএক্স ভবন। এছাড়া বিভিন্ন হাটবাজার ও শপিং কমপ্লেক্সের সঙ্গে সংযুক্ত আরও বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার আগে এসব স্থাপনায় দৃশ্যমান সংস্কারকাজ হয়নি। বর্তমানে কয়েকটি মার্কেটে সংস্কারকাজ চলছে।
তবে এনএক্স ভবনটি পুরোপুরি পুড়ে যাওয়ায় সেখানে স্বাভাবিক সংস্কারকাজ করা সম্ভব নয় বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বরিশাল নগর ভবনও দীর্ঘদিন আগে ব্যবহার অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় সেখানে সংস্কারকাজ করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনাবাসিক ভবন ও বিনোদনকেন্দ্র সংস্কারে যে বিপুল অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিসিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের দাবি, এর সঙ্গে বাস্তব কাজের সামঞ্জস্য নেই।
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও জন সুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক ও সনাক সদস্য শুভঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, “বরিশাল নগরবাসী এমনিতেই বিনোদনবঞ্চিত। বেলস পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ বর্তমান প্রশাসক শুরু করেছেন দুই মাসের বেশি হয়নি। আরও কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্রে তিনি সংস্কারকাজ করছেন। কিন্তু ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরিশালে দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। ওই সময়ে সংস্কারকাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বিল উত্তোলন করা হয়ে থাকলে, তা অনিয়ম ছাড়া আর কিছুই নয়।”
বিসিসির প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, “সংস্কারকাজ বর্তমানে চলছে। আগেও কিছু কিছু কাজ হয়েছে। কত টাকার কাজ হয়েছে, তা হিসাব শাখা ভালো বলতে পারবে।”
একই স্থানে বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার সংস্কারকাজ দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ভালো জানে।”
এ বিষয়ে বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “এ ঘটনাগুলো আমার সময়ের নয়। এগুলো আগের ঘটনা। এর পরও দুর্নীতি হলে অবশ্যই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”
বিসিসির বাজেটে দেখানো বিপুল অর্থের ব্যয় বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে হয়েছে—তা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেটের বরাদ্দ, প্রকল্পের কার্যাদেশ, কাজের পরিমাণ, বিল-ভাউচার ও বাস্তবায়নের তথ্য যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।