মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৭ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার ॥ নিখোঁজ ইয়াসমিন আক্তার ওরফে সুমি (২৪) জীবিত না মৃত তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সহ ঘটনাচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্লু এড়িয়ে গিয়ে বরিশাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলার আসামীদের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে বরিশাল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর এসআই বাসুদেব সরকার। এমন অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বরিশাল বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর গ্রামের মো. হাসান হাওলাদারের মেয়ে এবং নিখোঁজ সুমির বোন খাদিজা বেগম (৩৯)। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল’২৬) বেলা ১২টায় বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
খাদিজার পক্ষে লিখিত বক্তব্যে তার ভাই আ.হাকিম রনি বলেন, ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে ছোট ইয়াসমিন। নিখোঁজ ইয়াসমিনের বর্তমান অবস্থান সহ তার বৈধভাবে ক্রয় করা ব্যবহৃত স্মার্টফোনের তথ্য, নিখোঁজের পর নাঈম ও ইয়াসমিনের লোকেশনে একই অবস্থানে ছিল, বিবাহের পর সন্তান নষ্ট করার প্রমাণপত্র দেয়া হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এ সব তথ্যগুলো নেয়নি। ইয়াসমিন নিখোঁজ হওয়ার আগে পরে কোন কোন নম্বরে যোগাযোগ করেছে তাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি। বাবার পরিবারের সাথে ইয়াসমিনের তেমন ভালো সম্পর্ক খারাপ ছিল না। এ তথ্য মিথ্যা।
প্রতিবেদনে ইয়াসমিনের ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোনে মতি রুবি রানীর ব্যবহৃত মোবাইল ০১৩৪৪৯৬০৩১৮ নম্বর ব্যবহার হয়েছে ইয়াসমিনের ৮৬৪৫০১০৬৫১৫১৩৫০ এই আইএমইআই নাম্বারের মোবাইলে। মতি রুবি রানীর ভাষ্য, সে মোবাইলটি কিনেছে ফরিদপুর কোতয়ালী অন্তর্ভুক্ত তাজউদ্দিন মাতুডাঙ্গী এলাকার শহিদুল খানের ছেলে সম্রাট খান ওরফে সাইফুল খানের কাছ থেকে। ঘটনাচক্রে ইয়াসমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের এই আইএমইআই নম্বরে রুবি রানীর নম্বর ব্যবহার এবং মোবাইল ক্রয়ের তথ্য প্রমাণ উঠে আসলেও সম্রাট খান মোবাইলটি কোথায় পেয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বিষয়টি প্রতিবেদনের ১৪ নং অনুচ্ছেদের ৭ নং—এ উল্লেখ রয়েছে। বাদী বাটন মোবাইলের ঘটনাটি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানালে উল্টো সে তাকে মোবাইলটি নিয়ে আসতে বলেন। অথচ বাবুগঞ্জ থানা পুলিশের দেয়া তথ্যানুযায়ী— গত ২৪—০১—২০২৫ তারিখ সন্ধ্যার পর নিখোঁজ ইয়াসমিন ও তার স্বামী নাঈমের লোকেশন ছিল মতিমহল জিয়া সড়ক, বরিশাল।
ইয়াসমিনের খোঁজ না পেয়ে নির্যাতন, হত্যার উদ্দেশ্য অপরহরণ বা পতিতালয়ে বিক্রি করে ফেলেছে এমন অভিযোগ এনে গত ১২—০৮—২০২৫ তারিখে ৫ জনকে আসামি করে বরিশাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আমি (খাদিজা) একটি মামলা দায়ের করি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরিশাল পিবিআই এর এসআই বাসুদেব সরকার গত ০২—০৪—২০২৬ তারিখে ট্যাইব্যুনালে ভিকটিমের মূল তথ্যগুলো যাচাই—বাছাই না করে আসামিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এ প্রতিবেদন মানি না। ট্যাইব্যুনালের বিচারকের বরাবর তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিবো।
দায়েরকৃত মামলার আসামি হলেন— ইয়াসমিনের স্বামী— নাঈমুল হাসান (২৬) ও তার পিতা—মাতা নুরুল আমিন জোয়ারদার, নাসিমা বেগম সহ বরিশাল নগরীর জিয়া সড়ক এলাকার ভাড়াটিয়া বাসিন্দা জাহিদ হোসেন (২৮) ও সোহেল (২৭)। আসামি নাঈমের বন্ধু জাহিদ ও সোহেল। তার দুইজন বরগুনা বেতাগী উপজেলার বড় করুনা গ্রামের বাসিন্দা।
ইয়াসমিনের সন্ধান না পেয়ে গত ১৩—০৫—২০২৫ তারিখে আমি (খাদিজা) বাদী হয়ে ইয়াসমিনের স্বামী—নাইম হাসান (২৬) ও তার বাবা নুরুল আমিন (৫০), মা নাসিমা বেগম (৪৫) কে সহ ফুফু মরিয়ম বেগম (৪০) কে আসামি করে ঢাকা বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পল্লবী থানা) এর আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধি ১০৭/১১৭ (সি) ধারায় একটি পিটিশন মামলা (নং—২৩১/২৫) দায়ের করি। আসামি নাইমের স্থায়ী ঠিকানা হলো— বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার বিল চাঁপাড়ী গ্রামে, আর ফুফুর বাসা ঢাকা মিরপুর—১২ এর মুসলিম বাজার সংলগ্ন। আর আমি বসবাস করতাম পাশ্ববর্তী ঢাকা মিরপুর—১১ তে। এরপর গত ২১—০৭—২০২৫ তারিখে আমার (বাদী) সাথে আসামি নাইমের ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি “চুক্তিপত্র/অঙ্গীকারনামা” হয়। তাতে উল্লেখ থাকে, উভয়ই নিজ নিজ দায়িত্বে নিখোঁজ ইয়াসমিনকে খুঁজে বের করবে।
প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন রেখে নাঈমুল হাসান ওরফে নাঈম গত ৩০—১২—২০২৩ তারিখ ১ লাখ টাকা দেন মোহর ধার্য করে ইয়াসমিন কে বরিশাল নগরীর ১৪ নং ওয়ার্ড কাজী অফিসে বিয়ে করেছিল। তখন নাঈম বরিশাল হাতেম আলী কলেজ সংলগ্ন ‘হিমেল ফার্মেসী’ তে চাকুরী করতো এবং ইয়াসমিন চাকুরী করতো ওই ফার্মেসীর বিপরীতে থাকা ‘সারা ডেন্টাল কেয়ার’ নামক প্রতিষ্ঠানে। চাকুরী জীবনেই তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে হয়েছিল।
ঢাকা গাজিপুর ‘নারী প্রশিক্ষণ একাডেমি জিরানী’ নামক প্রতিষ্ঠানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেইলার ড্রেস মেকিং—এ প্রশিক্ষণরত অবস্থায় গত ২১—০১—২০২৫ থেকে ২৬—০১—২০২৫ তারিখ পর্যন্ত ছুটির আবেদন করার পর থেকেই ইয়াসমিন নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় হাকিম রনি গত ০৫—০২—২০২৫ তারিখে ঢাকা গাজীপুর কাশিমপুর থানায় একটি সাধারণ ডাইরী দায়ের করেন। প্রশিক্ষণ সেন্টারের মধ্যে থাকা ইয়াসমিনের কক্ষে পাওয়া যায় একটি চিরকুট। যাতে উল্লেখ থাকে—
“আমি ইয়াসমিন আমার বাসা বরিশাল, আমি সগজ্ঞানে লিখতেছি যে আমি আমার পছন্দে একটা ছেলেকে বিয়ে করছি তার নাম নাঈম হাসান আমার বিয়ের এক বছর হয়ে যাওয়ার পরেও আমার জামাই বা তার পরিবারের কেউ আমার ভরণ পোষনের কোন খরচ দেয়নি উল্টে আমার জামাই আমার থেকে অনেক টাকা নিয়েছে এবং আমার বাসার সব মালামাল তাদের বাড়িতে নিয়েছে, বলেছে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, গত বছর ফ্রেব্রুয়ারীতে একবার গিয়েছিলাম আমি আমার শশুর বাড়ি তারপর থেকে আমি আমার বাবার বাড়িতে থাকে, আমার জামাই এই এক বছরে আমার কাছ থেকে অনেক টাকা নিছে কিন্তু না সে আমাকে তার কাছে রাখে, না ঠিকমতো যোগাযোগ করে, তাই আমি নিজের ইচ্ছায় নিজেকে শেষ করে দিচ্ছি, আর এর জন্য দায়ী আমার জামাই, ইতি ইয়াসমিন”।
বিষয়গুলো সম্পর্কে বরিশাল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর এসআই বাসুদেব সরকার বলেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। মামলার বাদী কিছু তথ্য আগে পরে দিয়েছে। তাই শেষ সময় সব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। যেমন টার্স মোবাইলের বিষয়টি সাধারণ ডাইরী করার সময়ই উল্লেখ করলে আরো ভালো হয়। ভিকটিম ইয়াসমিনের নিখোঁজের পর অবস্থান জানতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্ত ঘটনারস্থল ঢাকা, বরিশাল ও ফরিদপুর হওয়ায় যথাযথ সময় সঠিক তথ্য পেলে আরো গভীরে তদন্ত করা যেত।
অপরদিকে অভিযুক্ত নাঈমুল হাসান ওরফে নাঈমের ব্যবহৃত ৩টি মোবাইল নম্বারই বন্ধ পাওয়া যায়। নাঈমের বাবার মুঠোফোনে বলেন, তিনি সহ তার পরিবারের সদস্যরা ইয়াসমিনকে খুঁজে ছিল এবং বরিশাল ও ঢাকায় গিয়েছিল। নিখোঁজের পর ইয়াসমিন ও নাঈম একই লোকেশনে ছিল এমন প্রশ্নে তিনি নাঈম আসলে মুঠোফোনে আলাপ করিয়ে দিবেন বলে ব্যক্ত করেন।
Leave a Reply