শনিবার, ১৮ Jul ২০২৬, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন
পণ্যবাহী জাহাজের নাবিকদের তীরে পৌঁছে দেওয়ার আড়ালে চলছে রমরমা চোরাই তেলের কারবার। আর এই জ্বালানি তেল অবৈধভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যাদের মাধ্যমে তেল বিনিময়ে জাহাজের মাদকাসক্ত ক্রুদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবাসহ নানান মাদকের ছোট—বড় চালান।
শুধু চোরাই তেলের কারবারই নয়; এই চক্র রীতিমতো অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতে সরকারি সম্পত্তি দখল করে গড়ে তুলেছে একাধিক স্থাপনা। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না কেউ। এমনকি নির্দিষ্ট এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশেও রয়েছে সিন্ডিকেটের নিষেধাজ্ঞা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে নির্মিত পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জালানি (কয়লা) নিয়ে আসে একাধিক লাইটার জাহাজ। পায়রা সমুদ্রবন্দরের আওতাধীন এই জাহাজগুলো প্রায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট জেটি দিয়ে পণ্য খালাস করে। তবে এই পণ্য খালাসের আড়ালেই লুকিয়ে আছে মাদকসহ লাখ লাখ টাকার চোরাই তেলের বাণিজ্য। কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অবৈধ উপায়ে রমরমা এমন বাণিজ্যের চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একাধিক কোম্পানির লাইটার জাহাজ থেকে প্রায় প্রতিদিন চোরাই পথে তেল পাচার করছে জাহাজের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অসংখ্য অসাধু ব্যক্তিরা সরাসরি এই তেল পাচরে জড়িত। এর বিনিময়ে এসব ব্যক্তিরা লাখ লাখ টাকার নগদ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ডেভিড (ছদ্মনাম) জানান, স্থলপথে গড়ে তোলা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা অভিনব পদ্ধতিতে তৈরিকৃত ছোট ফাইবার বোর্ডে জাহাজের নাবিকদের তীরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। লোক দেখানো এই পারাপারের আড়ালেই চলে লাখ লাখ টাকার অবৈধ কার্যক্রম। তিনি বলেন, এসব ফাইবার বোর্ডে বিশেষ পদ্ধতিতে তেল মজুতের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে।
যার মাধ্যমে খুব সহজেই জাহাজ থেকে খুবই কম সময়ে কয়েক হাজার লিটার তেল অপসারণ করে তীরে ফিরে আসে বোর্ডগুলো। এরপর ফাইবার থেকে তেল ব্যারেল ভর্তি করে বিভিন্ন জায়গায় সাপ্লাই করা হয়। আর এসব তেল জাহাজ থেকে ৭০—৮০ টাকা ধরে ক্রয় করে কারবারিরা। পরে আবার সেসব তেল স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে ১০০ টাকা দরে বিক্রি করে জাহাজ থেকে সরাসরি তেল নামিয়ে আনা চোর চক্র।
তেল ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত কালু মিয়া (ছদ্মনাম) জানান, জাহাজে কর্মরত মাদকাসক্ত অনেক ব্যক্তিকে শুধু টাকা দিয়েই খুশি করা সম্ভব হয় না। তাদের ইয়াবা না দিলে তেল বিক্রি করবে না— এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। অসাধু এসব মানুষকে মাদক সাপ্লাই দিয়ে খুশি করতে পারলেই বোট বোঝাই করে চোরাই তেল পাওয়া যায়।
কালু মিয়া বলেন, স্থল পথে পুলিশি ঝামেলা হয় প্রায় সময়েই। মাঝেমধ্যে ব্যারেলবোঝাই তেলের চালান আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তবে তৈরিকৃত নকল কাগজ দেখিয়ে বৈধ তেল বলে আবার সেসব তেল মুক্ত করে আনা হয়। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের এক ব্যক্তির মাধ্যমে থানার কর্তাদের সঙ্গে মাস চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
তার ভাষ্যমতে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুলিশকে একটা নির্দিষ্ট অর্থ প্রতিমাসে পৌঁছে দেওয়া হয়। যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা না করে। তবে খাস জমিতে অবৈধ স্থাপনা তুলে চোরাকারবারির রমরমা বাণিজ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে বলে জানান তিনি।
পায়রা সমুদ্রবন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন শরীফ বলেন, এটা আসলে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। পায়রা বন্দর সীমানায় এমন কর্মকাণ্ড রোধে কোস্টগার্ডকে আরও জোরদার করা হবে। এ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো অবহিত করা হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে অবশ্যই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কলাপাড়া থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, থানা পুলিশের বিষয়ে কেউ কিছু বলে থাকলে তা সত্য নয়; সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ এ বিষয়গুলো নৌ—পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের বিষয়। আমাদের থানা পুলিশ কিছু তেল আটক করেছিল। তবে সেসব তেলের বৈধ কাগজপত্র পরে মালিক পক্ষ নিয়ে এসেছে।
কালবেলাকে