বৃহস্পতিবার, ২৫ Jun ২০২৬, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
ফয়সালকে ঠেকায় কে?

ফয়সালকে ঠেকায় কে?

সরকারি বিধিমালা ও পেশাগত সততাকে তোয়াক্কা না করে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে প্রবেশ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের আশ্রয়—প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার বাণিজ্যে সিন্ডিকেট তৈরি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিলাসবহুল উপঢৌকন দিয়ে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার মতো গুরুতর সব অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এই পুরো দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের প্রক্রিয়ায় অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন গণপূর্তের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা রূপম । সম্প্রতি বরিশাল দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ—পরিচালক রাজ কুমার সাহা জানিয়েছেন, এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ এসেছে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য—এর আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হতে যাচ্ছে।

​৩২তম বিসিএসের কর্মকর্তা এবং ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তঘর এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আলমের সরকারি চাকরিতে প্রবেশ প্রক্রিয়াই এখন বড় প্রশ্নের মুখে। বিশ্বস্ত সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, তিনি যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহার করে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন, সেই সনদটি ভুয়া। বিগত দিনে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি সামনে এসেছে। এই বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি সনদটির সত্যতা প্রমাণে কোনো প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ বা সদুত্তর দিতে পারেননি।

​এছাড়া সম্প্রতি গণপূর্তের চিফ ইঞ্জিনিয়ার খালেকুজ্জামান বরিশাল সফরে এলে তাকে ও তার পরিবারকে সন্তুষ্ট করতে অভিনব দুর্নীতির আশ্রয় নেন ফয়সাল আলম। নির্ভরযোগ্য তথ্যে জানা গেছে, চিফ ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী ও কন্যার জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার স্বর্ণালংকার এবং দামি শাড়ি কেনা হয়। আর এই পুরো কেনাকাটা ও অবৈধ অর্থ গ্রহণের তদারকিতে ছিলেন ফয়সাল আলমের দুর্নীতির অন্যতম সহযোগী, হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা রূপম । একজন সরকারি কর্মকর্তার সফরকে কেন্দ্র করে অধস্তন কর্মকর্তার এমন রাজকীয় উপঢৌকন দেওয়ার ঘটনা মূলত নিজের অনিয়ম ও দুর্নীতির ফাইল চাপা দেওয়ার অপচেষ্টা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

​ফয়সাল আলমের এই দুর্নীতির স্বভাব নতুন নয়, ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালেও তিনি একই ধরনের অনিয়ম করেছেন। ঝালকাঠিতে থাকাকালীন তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং এলাকায় তাকে আমুর পালকপুত্র বলা হতো। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাথে যুক্ত থেকে সে সময় তিনি আমুর পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ পাইয়ে দেন। সাধারণ ঠিকাদাররা তখন লিখিত অভিযোগ করলেও রাজনৈতিক কারণে কোনো তদন্ত হয়নি। বরিশালে বদলি হওয়ার পরও তিনি একই পথ বেছে নেন। এখানে এসে তিনি সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত হন এবং নৌকার ব্যাজ পরে দাপিয়ে বেড়াতেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও তিনি কৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন বলয়ের সাথে সখ্যতা গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

​বরিশাল গণপূর্তের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সাধারণ ঠিকাদারদের বঞ্চিত করে নির্দিষ্ট গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফয়সাল আলমের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে এবং হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা রূপমের সহযোগিতায় গণপূর্তে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মূল সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো খান বিল্ডার্স, খান ট্রেডার্স, বাবর অ্যাসোসিয়েটস এবং এসএ এন্টারপ্রাইজ। বিশেষ করে খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্সকে বরিশাল মেরিন একাডেমি, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, ক্যান্সার হাসপাতাল, বিটাক, তালতলী মডেল মসজিদ, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিমানবন্দর থানা ভবন এবং শের—ই—বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উন্নয়ন ও সংস্কারের শত শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

​ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর বাজেট বাড়ানোর নামে পুনরায় বরাদ্দ আদায়ের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এছাড়া কাজের যোগ্যতা না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথ উদ্যোগ দেখিয়ে পুনরায় টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে লিড পার্টনারের শর্ত অনুযায়ী ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণ থাকার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। এসব কাজের বিনিময়ে প্রতিটি বিল পাস করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে মোটা অঙ্কের কমিশন বা ঘুষ নিতেন ফয়সাল আলম ও তার সহযোগী রূপম সাহেব। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল গণপূর্তের কার্যালয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। উল্টো প্রতিবাদী ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাতিল বা কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়।

​এইসব সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল দুদকের উপ—পরিচালক রাজ কুমার সাহা জানিয়েছেন যে, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তারা শুনেছেন এবং এ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগও দপ্তরে জমা পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসহ প্রয়োজনীয় তথ্য—প্রমাণ হাতে আসামাত্রই তারা আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু করবেন। দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর বলেও তিনি পরিষ্কার করেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং স্থানীয় সাধারণ ঠিকাদারদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া সরাসরি দুর্নীতির শামিল। এর ফলে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকারি প্রকল্পের মান ও সময়মতো বাস্তবায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 Raytahost.Com
Design by RaytaHost