
বরিশাল থেকে কুয়াকাটা মহাসড়কে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নাম ব্যবহার করে যাত্রীবাহী বাস থেকে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটের ছয়টি পয়েন্টে টার্মিনাল ও পৌর টোলের নামে চলছে অর্থ আদায়। অথচ অধিকাংশ বাস সংশ্লিষ্ট বাসটার্মিনাল ব্যবহারই করে না। এমনকি বাসটার্মিনাল নেই, এমন পৌরসভার নামেও নেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা।
পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটাগামী বাসগুলোকে পথে পথে এসব টাকা দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মাসের হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটি টাকারও বেশি।
কুয়াকাটা-কক্সবাজার রুটে নিয়মিত যাত্রী নিয়ে চলাচলকারী একটি পরিবহণ কোম্পানির বাসচালক মোনাব্বের মোল্লা বলেন, কক্সবাজার থেকে ঢাকা হয়ে বরিশাল পর্যন্ত আসতে একাধিক সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা অতিক্রম করতে হয়। ৬৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে কোথাও সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভার নামে টোল দিতে হয় না। অথচ বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত যেতে ছয়টি পয়েন্টে টোলের নামে টাকা দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রবেশ ও চলাচলের সময় দুই পয়েন্টে টাকা দিতে হয়।
নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা-কুয়াকাটা রুটে চলাচলকারী গ্রিনলাইন পরিবহণের এক চালক জানান, বরিশালের নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী বাসটার্মিনাল এলাকায় টার্মিনাল টোলের নামে যথাক্রমে ৬০ ও ৫০ টাকা করে মোট ১১০ টাকা আদায় করা হয়। এ ছাড়া পটুয়াখালীতে ১০০, বরগুনার আমতলীতে ১০০, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ৫০ এবং কুয়াকাটায় ১০০ টাকা পৌর টোল দিতে হয়। অথচ এসব পৌর এলাকার মধ্যে কেবল কুয়াকাটা ছাড়া অন্য কোথাও তাদের বাস টার্মিনাল ব্যবহার করে না।
ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে চলাচলকারী পরিবহণ মালিক শাহাদাত হোসাইন লিটন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো বাস সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভার আওতাধীন বাসটার্মিনাল ব্যবহার করলে নির্ধারিত রাজস্ব দিতে হয়। কিন্তু তাদের বাসগুলো সরাসরি মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে। টার্মিনাল ব্যবহার করে না। প্রয়োজনে মহাসড়কেই গতি কমিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এরপরও টোলের নামে বিপুল অর্থ আদায়ের যৌক্তিকতা কী, তা কেউ পরিষ্কার করছে না।
আরেক পরিবহণ মালিক মিজানুর রহমানের দাবি, একটি বাসের আসা-যাওয়া মিলিয়ে ৯২০ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-কুয়াকাটা রুটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার বাস চলাচল করে। এ হিসাবে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় হচ্ছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমতলীতে কোনো বাসটার্মিনাল না থাকলেও সেখানে টার্মিনাল টোলের নামে টাকা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বরিশালের গৌরনদী, উজিরপুর ও বাকেরগঞ্জ পৌরসভা থাকলেও সেখানকার কর্তৃপক্ষ বাস থেকে এ ধরনের টোল আদায় করে না।
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) রূম্পা সিকদার বলেন, নগরীর দুটি বাসটার্মিনাল লিজ দেওয়া হয়েছে। যেসব বাস টার্মিনাল ব্যবহার করবে, তাদের নির্ধারিত রাজস্ব দিতে হবে। তবে মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী বাস থেকে টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।
আমতলী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন থেকে পৌর টোলের নামে টাকা আদায় বন্ধে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এরপরও কেউ টাকা আদায় করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলাপাড়া পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা কাব্য লাল চক্রবর্তী বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে বাসটার্মিনাল লিজ দেওয়া হয়েছে। তবে মহাসড়ক কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, মহাসড়কে চলাচলকারী বাস থেকে টার্মিনাল ও পৌর টোলের নামে অর্থ আদায়ের বৈধতা কোথায়? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে মহাসড়ক থেকে টোল আদায়ের সুযোগ না থাকার বিষয়টি উঠে এলেও বাস্তবে কেন এই অর্থ আদায় বন্ধ হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকরা।