
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অনুসন্ধান থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়া এবং অপকর্ম থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দপ্তরে জোর লবিং ও দৌড়ঝাঁপ করছেন এই সরকারি কর্মকর্তা।
সাড়ে ৭ কোটি টাকা লোপাট ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়
ঠিকাদার ও বিসিসি সূত্রে জানা গেছে, নির্দিষ্ট হারে ঘুষের টাকা না পেলে কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না হুমায়ুন কবির।
সংস্কারের নামে অর্থ লোপাট: সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের অ্যানেক্স ভবন সংস্কারের নামে সাড়ে ৭ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ এই কর্মকর্তার পকেটে গেছে বলে অভিযোগ।
বিপুল সম্পদ: দুর্নীতি করে কয়েক বছরে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বরিশালে একটি ছয় তলা ভবন ও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে তার।
ব্যবসায় বিনিয়োগ: বিভিন্ন ব্যবসায় বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের গুঞ্জন রয়েছে। ব্যবসার তদারকিতে এই কর্মকর্তা সপ্তাহে দুই দিন ঢাকায় অবস্থান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদারদের জিম্মি করে ‘কমিশন’ বাণিজ্য -বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কাজ পাওয়ার পর থেকে বিল পরিশোধ হওয়া পর্যন্ত প্রতি টেবিলে ঘুষ দিতে হয়, যার সিংহভাগ যায় প্রকৌশল শাখায়।
”উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত সাড়ে চার থেকে পাঁচ শতাংশ (৪.৫% – ৫%) হারে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে বিল পরিশোধের ফাইল আটকে রেখে নানা টালবাহানা করা হয়।” — অভিযুক্ত ঠিকাদারবৃন্দ
বকেয়া বিলেও কোটি টাকার কমিশন:শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ও প্রয়াত আহসান হাবিব কামালের আমলের বকেয়া বিল ছাড় করাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন এই কর্মকর্তা। অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১ থেকে দেড় কোটি টাকার বকেয়া বিল ছাড়াতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে, যা প্রকৌশল শাখার অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও বণ্টন করা হয়।
ফৌজদারি মামলা ও রাজনৈতিক পরিচয়:-গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মামলার আসামি হুমায়ুন কবির। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর সুপারিশ করা ‘বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ’ বরিশাল সিটি কর্পোরেশন শাখার প্রস্তাবিত কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন হুমায়ুন কবির।
শাস্তির বদলে পদোন্নতি!-আওয়ামী লীগপন্থী এবং ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৫ই আগস্টের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। সাবেক নগর প্রশাসক রায়হান কাউসার তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি দিয়ে ‘প্রধান প্রকৌশলী’ হিসেবে পদায়ন করেন, যা নিয়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা মামলা সম্পর্কিত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির। তার দাবি, একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।